প্রশাসনিক শহর থেকে যেভাবে ‘মেগাসিটি’ হয়ে উঠছে Islamabad
- আপডেট সময় : ১১:৫৬:০৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

পাকিস্তানের রাজধানী Islamabad এখন আর কেবল একটি পরিকল্পিত প্রশাসনিক শহর হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন নতুন আবাসন প্রকল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার, বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিকাশ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দ্রুত বিস্তারের কারণে এটি এখন একটি বৃহৎ মহানগর অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। তবে এই ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শহরের প্রশাসনিক কাঠামো কতটা আধুনিক ও কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
২০২৩ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, Islamabad ক্যাপিটাল টেরিটরির বর্তমান জনসংখ্যা ২৩ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। প্রতি বছর এখানে ২ দশমিক ৮ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। এই মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩ শতাংশ মানুষ এখনো গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করেন। ফলে Islamabad একই সাথে জাতীয় রাজধানী, একটি দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকা নগরাঞ্চল এবং একটি বিস্তৃত গ্রামীণ এলাকা—এই তিন রকমের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতাকে ধারণ করছে।
এই বহুমুখী বাস্তবতাই মূলত প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বড় সমস্যা তৈরি করছে। বর্তমানে Islamabad-এর একই ভৌগোলিক এলাকায় একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের দায়িত্ব পালন করছে। ফেডারেল মন্ত্রণালয়, ক্যাপিটাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (সিডিএ) এবং Islamabad ক্যাপিটাল টেরিটরি প্রশাসনের মতো একাধিক সংস্থার দায়িত্ব ও ক্ষমতা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ফলে রাস্তাঘাট সংস্কার, বর্জ্য অপসারণ, পানি সরবরাহ, আবাসন কিংবা পরিবেশ সুরক্ষার মতো নাগরিক সেবার জন্য চূড়ান্তভাবে কোন প্রতিষ্ঠানটি দায়ী, তা সাধারণ মানুষের কাছে কখনোই পরিষ্কার থাকে না।
এই প্রশাসনিক জটিলতার পাশাপাশি রাজনৈতিক জবাবদিহিতার বিষয়টিও বেশ নাজুক। Islamabad-এর বাসিন্দারা জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিয়ে ফেডারেল প্রতিনিধি নির্বাচন করলেও, শহরের দৈনন্দিন নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য কোনো নির্বাচিত স্থানীয় সরকার কাঠামো নেই। রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা থাকলে, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সংকট দেখা দিলে কিংবা অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে নাগরিক ভোগান্তি বাড়লে বাসিন্দারা কাকে রাজনৈতিকভাবে জবাবদিহি করবেন, সেই পথ বন্ধ রয়েছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য Islamabad-এর জন্য একটি নির্বাচিত আঞ্চলিক বা বিশেষ ক্যাপিটাল টেরিটরি সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এমন একটি দ্বিমুখী শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি, সংসদ, কূটনৈতিক মিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো বিষয়গুলো ফেডারেল সরকারের অধীনে থাকবে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ, স্থানীয় গণপরিবহন, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো নাগরিক সেবাগুলো থাকবে একটি নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের অধীনে।
প্রস্তাবিত এই কাঠামোয় একটি নির্বাচিত আইনসভা বা অ্যাসেম্বলি স্থানীয় আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্ব পালন করতে পারে। এই নগর সরকারের নেতৃত্বে থাকবেন একজন শক্তিশালী নির্বাচিত প্রধান নির্বাহী, যিনি চিফ মিনিস্টার বা মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে শুধু political ক্ষমতা হস্তান্তর করলেই চলবে না, স্থানীয় সরকারের হাতে যদি বাস্তব প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং নিজস্ব আয়ের পর্যাপ্ত উৎস না থাকে, তবে তা কেবল আরেকটি অকার্যকর প্রশাসনিক স্তরে পরিণত হবে।
এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার শাসন কাঠামোকে উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটাল টেরিটরিতে একটি ২৫ সদস্যের নির্বাচিত আইনসভা রয়েছে, যা একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব পালন করে। এই আইনসভা আইন প্রণয়ন ও সরকারি ব্যয়ের তদারকি করে এবং একজন চিফ মিনিস্টার আঞ্চলিক সরকার পরিচালনা করেন। Islamabad-এর ক্ষেত্রে এই মডেলের হুবহু প্রয়োগ না হলেও, জাতীয় রাজধানীর ভেতরে কীভাবে ফেডারেল ও স্থানীয় নির্বাচিত শাসন সহাবস্থান করতে পারে, তার একটি ভালো দিকনির্দেশনা এটি হতে পারে।
Islamabad-এর নগর ব্যবস্থাপনায় অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। আবাসন, পরিবহন, সড়ক পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার, পানি সরবরাহ এবং পরিবেশগত বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হলেও বর্তমানে এগুলো পৃথক পৃথক সংস্থার মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করা হয়। এর পরিবর্তে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত মহানগর পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে Islamabad-এর পাহাড়, বন, সবুজ এলাকা ও প্রাকৃতিক জলাধারগুলোর ওপর নগরায়ণের যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব সমন্বিত পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি।
একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারের জন্য নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকা আবশ্যক। সম্পত্তি করসহ বিভিন্ন স্থানীয় করব্যবস্থা এর আয়ের উৎস হতে পারে। পাশাপাশি, জাতীয় রাজধানী হিসেবে Islamabad-এ সংসদ, কূটনৈতিক মিশন ও বিভিন্ন ফেডারেল প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতির কারণে যে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ থাকে, তা মেটাতে ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ক্যাপিটাল গ্রান্ট বা অনুদানের ব্যবস্থাও রাখা প্রয়োজন।
Islamabad-কে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রদেশে রূপান্তর না করেও ফেডারেল ও স্থানীয় নাগরিক দায়িত্ব পৃথক করার মাধ্যমে এই সংকট সমাধান সম্ভব। এ বিষয়ে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগও লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৬ সালের জুনে পাকিস্তানের পরিকল্পনামন্ত্রী একটি নির্বাচিত Islamabad ক্যাপিটাল টেরিটরি অ্যাসেম্বলি এবং স্থানীয়ভাবে দায়বদ্ধ প্রধান নির্বাহী প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, একটি ২৭ সদস্যের অ্যাসেম্বলি গঠন করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশের মতো জনসেবামূলক খাতে প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া যেতে পারে, যেখানে কিছু স্পর্শকাতর দায়িত্ব ফেডারেল সরকারের হাতেই থাকবে।
এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে Islamabad-এর শাসনব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আসবে। তবে সিডিএসহ বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এবং নতুন কর্তৃপক্ষের ক্ষমতার সীমানা স্পষ্ট না করা হলে জটিলতা পুরোপুরি দূর নাও হতে পারে। মূলত Islamabad-এর এই পরিস্থিতি একটি বড় প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে—একটি শহর যখন দ্রুত জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক দিক থেকে বড় হতে থাকে, তখন তার পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামো কতদিন কার্যকর রাখা সম্ভব? রাজধানী হিসেবে জাতীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেখানকার বাসিন্দাদের দৈনন্দিন নাগরিক সমস্যা সমাধানের জন্য একটি জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ৫২আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১: ১২




























