ঢাকা ১১:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে ইসি অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ ঝিনাইদহে পুকুরে ডুবে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রের মৃত্যু অনারারি ডক্টরেট পেলেন বলিউড অভিনেত্রী রানী মুখার্জি প্রাণ গ্রুপে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার পদে চাকরির সুযোগ দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ ১১ জনের প্রাণহানি হাসিনাকে ‘অমূল্য সম্পদ’ বলা চসিক সচিবের অডিও ফাঁস কিশোরগঞ্জে ইমাম ও পুরোহিতদের সম্মানি ভাতা কার্যক্রম উদ্বোধন করছেন প্রধানমন্ত্রী কিশোরগঞ্জের পথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইনিংস ব্যবধানে হার এড়ালো অস্ট্রেলিয়া, লিড মাত্র ১৫ রানের

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ ও ভারতের উদ্বেগ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:০৩:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন এক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও এই জোট এখনই 'মুসলিম ন্যাটো'তে পরিণত হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে, তবুও সৌদি অর্থ, তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের বিশাল সামরিক সক্ষমতা—এই তিনের সমন্বয় আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। এই নতুন জোটের প্রভাব নিয়ে ভারত বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করে আসছে। ১৯৫০-এর দশক থেকেই দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে সেই দীর্ঘ প্রচেষ্টাই যেন আরো সুসংহত রূপ পেল। চুক্তির পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সৌদি আরব কি পাকিস্তানের দুর্বল অর্থনীতিকে আরো বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দেবে? তুরস্কের অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি কি পাকিস্তানের অস্ত্রভান্ডারে আরো ব্যাপকভাবে যুক্ত হবে? আর শেষ পর্যন্ত এই তিন দেশের সমন্বয় কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো শক্তি-বলয়ের জন্ম দেবে?

চুক্তিটিকে দেখার দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। সংশয়বাদীদের মতে, এর বাস্তব সামরিক গুরুত্ব এখনই অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই। কারণ একটি কার্যকর সামরিক জোট সাধারণত কোনো অভিন্ন শত্রুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, কিন্তু পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের নিরাপত্তা-স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। পাকিস্তানের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি মনে করেন, এটি মূলত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার চুক্তি; পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়। তার মতে, এর মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনসহ বিভিন্ন সহযোগিতা বাড়তে পারে। তবে এটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে দেখার কারণ নেই।

অন্যদিকে, চুক্তির গুরুত্ব বুঝতে হলে তিন দেশের দুর্বলতার বদলে তাদের শক্তিগুলোকে পাশাপাশি দেখতে হবে। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় সম্পদ বিপুল অর্থ। তেলসমৃদ্ধ দেশটির রয়েছে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং মিত্রদের সহায়তা করার মতো বিশাল আর্থিক সামর্থ্য। তুরস্কের শক্তি তার সামরিক প্রযুক্তি ও ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা শিল্প। ন্যাটোর সদস্য দেশটি গত কয়েক বছরে নিজস্ব অস্ত্রশিল্পকে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে বায়রাকতার টিবি-২ ড্রোন আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের কার্যকারিতার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আর পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অবদান তার বিশাল ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী—এর পাশাপাশি রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার। এই পারমাণবিক সক্ষমতাই জোটটিকে অন্য মাত্রার কৌশলগত গুরুত্ব দিতে পারে। সৌদি আরব দিতে পারে অর্থ, তুরস্ক প্রযুক্তি, আর পাকিস্তান দিতে পারে পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতার ছাতা।

চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কোনো এক সদস্যের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার প্রতিশ্রুতি। তবে বাস্তবে কোনো সদস্য দেশ অন্য একটি দেশের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তিন দেশের কৌশলগত স্বার্থ ভিন্ন হওয়ায় সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর আগে প্রত্যেককেই সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য বিবেচনা করতে হবে। ফলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বদলে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য, রসদ, প্রশিক্ষণ বা অন্যান্য সামরিক সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতের জন্য তুরস্কের অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা ইতোমধ্যে বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, অপারেশন সিন্দুরের সময় তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তারা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং আঙ্কারা পাকিস্তানকে শত শত ড্রোন, যার মধ্যে বায়রাকতার টিবি-২ও রয়েছে, সরবরাহ করেছে। তাকশশিলা ইনস্টিটিউশনের ডিফেন্স ফেলোশিপের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার অনিল রামানের মতে, তুরস্কের ভূমিকার সামরিক প্রভাবকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তার মতে, তুরস্ক ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও উন্নত ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান নির্মাতা। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পাওয়া বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও দেশটির সামরিক প্রযুক্তিকে আরো কার্যকর করে তুলেছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে তুরস্কের পরীক্ষিত অস্ত্রব্যবস্থা ও সামরিক অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে আরো বেশি প্রবাহিত হতে পারে—যা ভারতের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh

নিউজটি শেয়ার করুন

মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ ও ভারতের উদ্বেগ

আপডেট সময় : ০৮:০৩:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন এক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদিও এই জোট এখনই 'মুসলিম ন্যাটো'তে পরিণত হবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে, তবুও সৌদি অর্থ, তুরস্কের সামরিক প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের বিশাল সামরিক সক্ষমতা—এই তিনের সমন্বয় আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। এই নতুন জোটের প্রভাব নিয়ে ভারত বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন।

পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করে আসছে। ১৯৫০-এর দশক থেকেই দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে সেই দীর্ঘ প্রচেষ্টাই যেন আরো সুসংহত রূপ পেল। চুক্তির পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—সৌদি আরব কি পাকিস্তানের দুর্বল অর্থনীতিকে আরো বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দেবে? তুরস্কের অত্যাধুনিক সামরিক প্রযুক্তি কি পাকিস্তানের অস্ত্রভান্ডারে আরো ব্যাপকভাবে যুক্ত হবে? আর শেষ পর্যন্ত এই তিন দেশের সমন্বয় কি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো শক্তি-বলয়ের জন্ম দেবে?

চুক্তিটিকে দেখার দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। সংশয়বাদীদের মতে, এর বাস্তব সামরিক গুরুত্ব এখনই অতিরঞ্জিত করার সুযোগ নেই। কারণ একটি কার্যকর সামরিক জোট সাধারণত কোনো অভিন্ন শত্রুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, কিন্তু পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের নিরাপত্তা-স্বার্থ পুরোপুরি এক নয়। পাকিস্তানের সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত হুসেইন হাক্কানি মনে করেন, এটি মূলত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার চুক্তি; পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট নয়। তার মতে, এর মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনসহ বিভিন্ন সহযোগিতা বাড়তে পারে। তবে এটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ হিসেবে দেখার কারণ নেই।

অন্যদিকে, চুক্তির গুরুত্ব বুঝতে হলে তিন দেশের দুর্বলতার বদলে তাদের শক্তিগুলোকে পাশাপাশি দেখতে হবে। সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় সম্পদ বিপুল অর্থ। তেলসমৃদ্ধ দেশটির রয়েছে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং মিত্রদের সহায়তা করার মতো বিশাল আর্থিক সামর্থ্য। তুরস্কের শক্তি তার সামরিক প্রযুক্তি ও ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা শিল্প। ন্যাটোর সদস্য দেশটি গত কয়েক বছরে নিজস্ব অস্ত্রশিল্পকে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে বায়রাকতার টিবি-২ ড্রোন আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের কার্যকারিতার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছে। আর পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অবদান তার বিশাল ও অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী—এর পাশাপাশি রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার। এই পারমাণবিক সক্ষমতাই জোটটিকে অন্য মাত্রার কৌশলগত গুরুত্ব দিতে পারে। সৌদি আরব দিতে পারে অর্থ, তুরস্ক প্রযুক্তি, আর পাকিস্তান দিতে পারে পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতার ছাতা।

চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—কোনো এক সদস্যের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার প্রতিশ্রুতি। তবে বাস্তবে কোনো সদস্য দেশ অন্য একটি দেশের যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়বে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। তিন দেশের কৌশলগত স্বার্থ ভিন্ন হওয়ায় সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর আগে প্রত্যেককেই সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও সামরিক মূল্য বিবেচনা করতে হবে। ফলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বদলে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য, রসদ, প্রশিক্ষণ বা অন্যান্য সামরিক সহায়তা দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।

ভারতের জন্য তুরস্কের অংশটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্কের সামরিক সহযোগিতা ইতোমধ্যে বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, অপারেশন সিন্দুরের সময় তুরস্কের সামরিক কর্মকর্তারা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন এবং আঙ্কারা পাকিস্তানকে শত শত ড্রোন, যার মধ্যে বায়রাকতার টিবি-২ও রয়েছে, সরবরাহ করেছে। তাকশশিলা ইনস্টিটিউশনের ডিফেন্স ফেলোশিপের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার অনিল রামানের মতে, তুরস্কের ভূমিকার সামরিক প্রভাবকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। তার মতে, তুরস্ক ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও উন্নত ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান নির্মাতা। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে পাওয়া বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও দেশটির সামরিক প্রযুক্তিকে আরো কার্যকর করে তুলেছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে তুরস্কের পরীক্ষিত অস্ত্রব্যবস্থা ও সামরিক অভিজ্ঞতা পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়নে আরো বেশি প্রবাহিত হতে পারে—যা ভারতের সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh