ককরোচ আন্দোলন: কটূক্তিকারী শিক্ষার্থীদের ‘পথভ্রষ্ট’ বলে ক্ষমা করলেন মোদি
- আপডেট সময় : ০৬:০৫:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ’ আন্দোলনে নিজের ও প্রয়াত মায়ের বিরুদ্ধে কটূক্তি করা শিক্ষার্থীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ‘পথভ্রষ্ট’ ও ‘বিভ্রান্ত সন্তান’ হিসেবে বর্ণনা করে মোদি মন্তব্য করেছেন, তাদের শাস্তি দেওয়া বা আদালতে ঘোরানো নয়, বরং সঠিক পথ দেখানোই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল গত মে মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে পরীক্ষাটি বাতিল করা হলে পরের মাসে ২০ লাখেরও বেশি পরীক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় বসতে হয়। এই ঘটনার জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে তরুণদের নেতৃত্বে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) আন্দোলন শুরু হয়, যা দ্রুত দেশজুড়ে গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বেকার তরুণ ও আন্দোলনকারীদের ‘তেলাপোকা’ বলে মন্তব্য করার পর বিক্ষোভকারীরা ব্যঙ্গাত্মকভাবে নিজেদের আন্দোলনের নাম দেন ‘ককরোচ’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিম ও বিদ্রূপের মাধ্যমে তারা শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবি তোলেন। রাজধানী নয়াদিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার বিক্ষোভকারীদের সব দাবি মেনে নেয়। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা না করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই প্রতিশ্রুতির পরও বিজেপি শাসিত কয়েকটি রাজ্যে শত শত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। আন্দোলনের সময় কিছু বিক্ষোভকারী নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান এবং প্রধানমন্ত্রী মোদিকে লক্ষ্য করে আপত্তিকর স্লোগান দেন। অন্যদিকে, মোদির সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী বিক্ষোভকারী ও কিশোরীদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস করে তাদের ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একটি ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, এরা আমাদের পথভ্রষ্ট সন্তান। তাদের সঠিক পথ দেখানো আমাদের দায়িত্ব। শাস্তি দিয়ে, আদালতে ঘুরিয়ে বা সমাজে হয়রানি করে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিক্ষোভের সময় তার ও তার প্রয়াত মায়ের উদ্দেশে অত্যন্ত জঘন্য ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের মেয়েরা কীভাবে এমন ভাষা ব্যবহার করতে পারে, তা আমাদের সংস্কৃতির জন্য বড় ধাক্কা। তা সত্ত্বেও তিনি তাদের ক্ষমা করে দিতে চান বলে জানান।
গত মাসে আন্দোলন চলাকালে দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ হয়। শিক্ষার্থীরা সংসদের দিকে পদযাত্রার চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, ছররা গুলি ও লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এই দমন-পীড়ন নিয়ে মোদির নীরবতার সমালোচনা করেছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাধিকা কুমার। তিনি বলেন, রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো দমন-পীড়ন নিয়ে মোদি নীরব থাকলেও ইনস্টাগ্রামে এসে নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরছেন। বছরের পর বছর এই সরকারের সমর্থকেরা অনলাইনে নারীদের গালিগালাজ ও ভয় দেখিয়েছে, আর এখন প্রধানমন্ত্রী নৈতিকতার দোহাই দিয়ে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন।
আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে গত ২৭ জুলাই অভিযোগ করা হয়, সরকার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বিভিন্ন রাজ্যে শত শত শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে। শিক্ষার্থীদের ওপর এই দমন-পীড়নের ঘটনায় বিরোধী দলগুলো ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেছে। বিক্ষোভের মুখে সরকার পরীক্ষাব্যবস্থা সংক্রান্ত আইন সংশোধনের একটি বিল সংসদে উত্থাপন করেছে, যেখানে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের জন্য আরও কঠোর শাস্তি ও জরিমানার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এদিকে, ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে নিয়ে আপত্তিকর ভিডিও পোস্ট করার অভিযোগে হায়দরাবাদে মেটা ইন্ডিয়ার প্রধান অরুণ শ্রীনিবাসের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে শুক্রবার পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন। মেটার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং সহযোগিতা করছেন। উল্লেখ্য, আদালতের নির্দেশে বেআইনি কনটেন্ট সরানোর নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে যেকোনো আইনি নির্দেশ পাওয়ার তিন ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে আপত্তিকর কনটেন্ট সরিয়ে ফেলতে হচ্ছে, যা আগে ছিল ৩৬ ঘণ্টা।


























