ইথিওপিয়ার ৫০ বিলিয়ন গাছের স্বপ্ন ও হালিমার লড়াই
- আপডেট সময় : ১২:২১:৩১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

একসময় প্রতিবেশী ও পরিচিতদের উপহাসের পাত্রী ছিলেন হালিমা কেদির। ইথিওপিয়ার ওরোমিয়া অঞ্চলের বেরবেরে জেলার এই ৩৫ বছর বয়সী নারী যখন গাছ লাগানো শুরু করেন, তখন অনেকেই প্রশ্ন তুলতেন—এই পরিশ্রমে কী লাভ? কিন্তু হালিমার অদম্য ইচ্ছায় আজ তাঁর বাড়ির চারপাশ কলা, জলপাই ও গ্রেভিলিয়াসহ নানা প্রজাতির গাছে সবুজ হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, প্রতিবেশীরা তাকে নিরুৎসাহিত করলেও সময়ের সাথে সাথে তারা বুঝতে পেরেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্যসংকট মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণই একটি কার্যকর সমাধান।
ইথিওপিয়া গত কয়েক দশকে ব্যাপক বন উজাড়ের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটি প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদন হারিয়েছে। কৃষিজমির সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিকভাবে কাঠ কাটা এবং জ্বালানি হিসেবে কাঠকয়লার ব্যাপক ব্যবহারই এর মূল কারণ। এতে মাটির গুণমান ও পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়েছে। এই সংকট উত্তরণে ২০১৯ সালে সরকার ‘গ্রিন লিগ্যাসি ইনিশিয়েটিভ’ শুরু করে। এর আওতায় সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বার্ষিক বন উজাড়ের হার ৯২ হাজার হেক্টর থেকে কমে ২৭ হাজার ৭০৩ হেক্টরে নেমে এসেছে। একই সময়ে বনভূমির পরিমাণ ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
সরকারের দাবি, এই কর্মসূচির মাধ্যমে গত সাত বছরে ৪৮ বিলিয়ন গাছ লাগানো হয়েছে। ২০১৯ সালে একদিনেই ৩৫ কোটি ৩০ লাখ চারা রোপণের রেকর্ডও রয়েছে। এখন তাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন গাছ লাগানো। হালিমার এই উদ্যোগ দেখে তাঁর প্রতিবেশী ফাতে আবদুলাহিও অনুপ্রাণিত হয়ে বৃক্ষরোপণ শুরু করেছেন। ফাতে বলেন, হালিমা স্থানীয় সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসে আমাদের সামনে উদাহরণ তৈরি করেছেন।
হালিমার এই কাজের পেছনে রয়েছে তাঁর ওরোমো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ‘গুদ্দিফাচা’ প্রথা, যেখানে কোনো শিশুকে আপন সন্তান হিসেবে গ্রহণ করা হয়। হালিমা প্রতিটি চারাকে নিজের সন্তানের মতোই লালন করেন। বেরবেরে এলাকায় পানির তীব্র সংকট থাকায় চারা বাঁচাতে তাকে প্রতিদিন প্রায় এক ঘণ্টা হেঁটে পানি আনতে হয়। হালিমার ১৩ বছর বয়সী ছেলে আনোয়ার হাসেন মায়ের এই লড়াই দেখে গর্বিত এবং সে নিজেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আজীবন কাজ করে যেতে চায়।
বর্তমানে ওয়াটারএইড ইথিওপিয়ার সহায়তায় ওই অঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার এই সবুজায়ন উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে। ওয়াটারএইড ইথিওপিয়ার পরিচালক আলেবাচেউ আদেম জানান, এ পর্যন্ত পরিবার ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৫৫ হাজার স্থানীয় প্রজাতির চারা বিতরণ করা হয়েছে, যার ৮৫ শতাংশই সফলভাবে বেড়ে উঠেছে। আদেমের মতে, বেরবেরের মতো শুষ্ক ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এই উদ্যোগ মানুষের টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ৫০ বিলিয়ন গাছের লক্ষ্যটি বিশাল হলেও, এটি কেবল সংখ্যার গল্প নয়; এটি হালিমার মতো মানুষের গল্প, যারা একটি করে চারা পুঁতে হারিয়ে যাওয়া সবুজকে ফিরিয়ে আনার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।





























