এসএসসির খাতা দেখায় গলদ: পুনর্মূল্যায়নে ফল বদলাল হাজারো শিক্ষার্থীর
- আপডেট সময় : ১০:০১:৫৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় এবার রেকর্ড সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তিত হয়েছে। উত্তরপত্র মূল্যায়নের এই ব্যাপক সংশোধনীর ঘটনা কেবল শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত নম্বর পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ব্যবস্থার গুণগত মানকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রথম দফায় পরীক্ষকদের দেওয়া নম্বর কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল, তা নিয়ে এখন নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
শিক্ষা বোর্ডগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়ন শেষে মোট ২৭ হাজার ৮৩৬ জন পরীক্ষার্থীর গ্রেড পরিবর্তিত হয়েছে। এছাড়া নম্বর পরিবর্তন হয়েছে ৫৬ হাজার ২৫৯ জনের। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, প্রথম দফায় অকৃতকার্য বা ফেল করা ৪ হাজার ৫৮৫ জন পরীক্ষার্থী আবেদন করার পর এখন পাস করেছে, যা গতবারের (২ হাজার ২০৭ জন) তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। একই সঙ্গে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৩ হাজার ৭৯ জন শিক্ষার্থী।
এত দিন শিক্ষা বোর্ডগুলোর নিয়মে কেবল উত্তরপত্রের প্রাপ্ত নম্বরের যোগ-বিয়োগ পরীক্ষা করার সুযোগ ছিল, যাকে পুনর্নিরীক্ষণ বলা হতো। এবারই প্রথম পুনর্নিরীক্ষণের পাশাপাশি উত্তরপত্র পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হয়েছিল। এই দ্বিমুখী ব্যবস্থার কারণেই ফল পরিবর্তনের পরিসর ও সংখ্যা দুটিই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। গত ১০ আগস্ট এসএসসির মূল ফল প্রকাশ করা হয়। এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার নেমে এসেছে ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডসহ ১১টি বোর্ডের গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। ফলের এই সামগ্রিক নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্যে পুনর্মূল্যায়ন শেষে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ফল বদলে যাওয়াকে শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
এ বিষয়ে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানান, এবার ফল পরিবর্তনের সংখ্যা বেশি হওয়ার মূল কারণ হলো পুনর্নিরীক্ষণ ও পুনর্মূল্যায়ন—দুটি কাজ একসঙ্গে করা হয়েছে। আগে শুধু পুনর্নিরীক্ষায় ফল পরিবর্তন হতো, এবার পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ থাকায় এই পরিবর্তন ব্যাপক হয়েছে। তবে পুনর্মূল্যায়নে এত বেশি পরিবর্তন হওয়া উচিত নয় বলে স্বীকার করেন তিনি। তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিবিশেষে মূল্যায়নে কিছু পার্থক্য হতে পারে। এবার শিক্ষকেরা টানা ১১ দিন অমানুষিক পরিশ্রম করে এই পুনর্মূল্যায়ন সম্পন্ন করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম দফার মূল্যায়নে যেসব উত্তরপত্রে 'অনুচিত' নম্বর দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেই পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৪ লাখ ২ হাজার ৫২ জন পরীক্ষার্থী উত্তরপত্র পুনর্নিরীক্ষণের জন্য আবেদন করে। তাদের আবেদনের আওতায় ছিল মোট ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৮টি স্ক্রিপ্ট বা পত্র। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের জ্যেষ্ঠ সিস্টেম অ্যানালিস্ট মনজুরুল কবীর জানান, শুধু ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেই এবার ৮ হাজার ৯৯৯ জনের গ্রেড পরিবর্তন হয়েছে। অথচ বিগত বছরগুলোতে ঢাকা বোর্ডে কেবল নম্বর গণনার ভুল সংশোধনের মাধ্যমে ফল পরিবর্তনের সংখ্যা ছিল অনেক কম। যেমন—২০২২ সালে ৭২৩ জন, ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৮৫ জন, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭২৩ জন এবং ২০২৫ সালে ২ হাজার ৯৪৬ জনের ফল পরিবর্তন হয়েছিল।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের বাধ্যবাধকতা থাকায় পরীক্ষকদের ওপর অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ উত্তরপত্র মূল্যায়নের চাপ থাকে। এই তাড়াহুড়োর কারণে মূল্যায়নে ভুলত্রুটি বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় কিছু পরীক্ষকের দায়িত্বহীনতা। জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর একটি নম্বরের ভুলও তার পাস-ফেল বা জিপিএ অর্জনে বড় প্রভাব ফেলে। তাই মূল্যায়নের সময়, পদ্ধতি ও পরীক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আমিরুল আলম খান এ প্রসঙ্গে বলেন, আগে পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ না থাকায় উত্তরপত্র মূল্যায়নে ভুল থাকলেও তা সংশোধনের কোনো কার্যকর পথ ছিল না। শিক্ষা বোর্ডে দীর্ঘ ৯ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন, অতীতে নিয়ম না থাকায় ভুলকারী পরীক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া যেত না। তবে এখন পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হওয়া একটি ভালো উদ্যোগ। তবে এই কাজটির সততা ও যত্ন নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে মূল্যায়নের ত্রুটির কারণে কোনো শিক্ষার্থীর জীবন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।



























