জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গ, বর্তমান রাজনীতি ও মুফতি আব্দুল মালেকের ইলমি অবস্থান
আলেমের বক্তব্যের জবাব হোক যুক্তিতে, গালিগালাজে নয়
- আপডেট সময় : ০৮:০৩:৪৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অঙ্গনে মতপার্থক্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন কোনো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়, তখন সেই বিতর্কের ধরন, ভাষা ও উদ্দেশ্যও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ধর্মীয় জ্ঞান, রাজনৈতিক আদর্শ ও আলেমদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের ক্ষেত্রে আবেগের চেয়ে যুক্তি, ব্যক্তিগত আক্রমণের চেয়ে প্রমাণ এবং বিদ্বেষের চেয়ে শালীনতাকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।
সম্প্রতি বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক সাহেবের জামায়াতে ইসলামী এবং রাজনৈতিক পরিসরে আলেমদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে কেউ একমত হতে পারেন, কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—একটি বক্তব্যের বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা কি যুক্তির পথ অনুসরণ করছি, নাকি ব্যক্তিগত আক্রমণ ও অশালীন ভাষার আশ্রয় নিচ্ছি?
জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গ: আবেগ নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামী একটি পরিচিত রাজনৈতিক শক্তি। দলটির আদর্শ, রাজনৈতিক কর্মসূচি, অতীত ভূমিকা এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে কোনো আলেমের পক্ষে বা বিপক্ষে রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া কিংবা কোনো দলের সঙ্গে জোটের বিষয়ে মত প্রকাশের বিষয়টিও যুক্তি ও প্রমাণের আলোকে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু বুঝতে হলে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, ব্যবহৃত শব্দের তাৎপর্য এবং তিনি কোন যুক্তির ভিত্তিতে এমন অবস্থান নিয়েছেন, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিচ্ছিন্ন কোনো বাক্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছোট ক্লিপ কিংবা অন্যের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করা মানেই তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত সঠিক—এমন নয়। আবার কোনো রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করা মানেই সেই দলের সব সমর্থক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে অসম্মান করার অধিকার অর্জন করা নয়। রাজনীতিতে আদর্শের প্রশ্ন থাকবে, মতবিরোধ থাকবে, এমনকি কঠোর সমালোচনাও থাকবে। তবে তা হতে হবে তথ্যনির্ভর, যুক্তিসংগত ও দায়িত্বশীল।
আলেমদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়েও সমাজে আলোচনা প্রয়োজন। আলেম হলেই কোনো রাজনৈতিক মতামত সমালোচনার ঊর্ধ্বে চলে যায় না; একইভাবে কোনো আলেমের রাজনৈতিক বক্তব্য অপছন্দ হলেই তাঁর জ্ঞান, শিক্ষা ও ব্যক্তিগত মর্যাদাকে অস্বীকার করা যায় না। বক্তব্যের মূল্যায়ন হবে বক্তব্যের ভিত্তিতে, ব্যক্তিগত বিদ্বেষের ভিত্তিতে নয়।
মুফতি আব্দুল মালেক: ইলম, গবেষণা ও দীর্ঘ সাধনার পরিচয়
মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক কেবল একজন ধর্মীয় বক্তা নন; তিনি হাদিসশাস্ত্র, ইসলামী আইন ও ফিকহ বিষয়ে উচ্চতর অধ্যয়ন ও গবেষণার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত একজন আলেম। প্রকাশিত জীবনীভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি পাকিস্তানের জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়ায় দাওরায়ে হাদিস সম্পন্ন করেন, পরবর্তী সময়ে উচ্চতর হাদিসশাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং দারুল উলুম করাচিতে মুফতি মুহাম্মাদ তাকি উসমানির তত্ত্বাবধানে ফিকহ ও ফতোয়া বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সৌদি আরবে শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহর তত্ত্বাবধানেও তিনি হাদিস ও ইসলামী আইনবিষয়ক গবেষণার কাজে যুক্ত ছিলেন।
১৯৯৬ সালে ঢাকায় মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে তিনি যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে ইসলামী শিক্ষা, হাদিস গবেষণা, ফতোয়া ও লেখালেখির ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা তৈরি হয়। ২০২৪ সালে তাঁকে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব তথ্য তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাজীবন ও গবেষণার পরিচয় তুলে ধরে।
তাঁর ইলমি পরিচয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে এই বাস্তবতা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, গভীর জ্ঞান অর্জন এক দিনের বিষয় নয়; এর পেছনে থাকে দীর্ঘ অধ্যয়ন, শিক্ষক-শিষ্য পরম্পরা, গবেষণা ও সাধনা। একজন গবেষক আলেমের কোনো বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা যেতে পারে, কিন্তু তাঁর অর্জিত জ্ঞান ও গবেষণাকর্ম সম্পর্কে না জেনে তাঁকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা বুদ্ধিবৃত্তিক সততার পরিচয় নয়।
তবে জ্ঞানের মর্যাদা রক্ষা করার অর্থ এই নয় যে কোনো আলেমের প্রতিটি বক্তব্যকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করতে হবে। বরং প্রকৃত জ্ঞানচর্চার সৌন্দর্য হলো—দলিলের ভিত্তিতে আলোচনা করা, ভুল মনে হলে তা শালীনভাবে তুলে ধরা এবং সত্য স্পষ্ট হলে তা গ্রহণ করার মানসিকতা রাখা।
আলেমদের গালিগালাজ করার আগে একবার ভাবুন
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতবিরোধের কারণে মানুষকে অপমান করা, কটূক্তি করা কিংবা অশালীন ভাষায় আক্রমণ করার প্রবণতা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে কোনো আলেমের বক্তব্য পছন্দ না হলে তাঁকে নিয়ে বিদ্রূপ, গালিগালাজ কিংবা অবমাননাকর মন্তব্য করা কোনোভাবেই সুস্থ চিন্তা ও দায়িত্বশীল নাগরিক আচরণের পরিচয় নয়।
যাঁরা মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের বক্তব্যের সমালোচনা করছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের বক্তব্য—আপনারা অবশ্যই প্রশ্ন তুলুন, যুক্তি দিন, দলিল উপস্থাপন করুন। তাঁর কোনো বক্তব্য ভুল মনে হলে সেই বক্তব্যের ভুল কোথায়, তা স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করুন। কিন্তু গালিগালাজ করে কি কোনো যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা যায়? অপমানজনক শব্দ ব্যবহার করে কি সত্যকে আরও স্পষ্ট করা সম্ভব?
একবার ভেবে দেখুন, যাঁকে নিয়ে মন্তব্য করছেন, তিনি দীর্ঘদিন ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান করার আগে নিজের ভাষা ও আচরণ সম্পর্কে ভাবা কি জরুরি নয়?
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: আলেমদের সম্মান করার অর্থ তাঁদের ভুলের সমালোচনা বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং সমালোচনা করতে হবে এমন ভাষায়, যাতে বক্তব্যের অসংগতি চিহ্নিত হয়, কিন্তু অশালীনতার কারণে মূল আলোচনাটিই হারিয়ে না যায়। একজন সাধারণ মানুষ হোন কিংবা উচ্চশিক্ষিত আলেম—সবার বক্তব্যের মূল্যায়ন যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে হওয়া উচিত।
ইসলামি নৈতিকতায়ও মানুষের সঙ্গে উত্তম ভাষায় কথা বলা, অপমান ও বিদ্রূপ থেকে বিরত থাকা এবং জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সঙ্গে আলোচনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অতএব, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের সমালোচনার ক্ষেত্রেও শালীনতা বজায় রাখা কেবল সামাজিক ভদ্রতা নয়; এটি নৈতিক দায়িত্বেরও অংশ।
ধর্মীয় মর্যাদা ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য—দুটিকে গুলিয়ে ফেলবেন না
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, কেউ কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করলে তাঁর সব বক্তব্যকে সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয়; আবার কেউ সেই দলের সমালোচনা করলে তাঁর ভালো কাজ ও জ্ঞানকেও অস্বীকার করা হয়। এই প্রবণতা সমাজকে যুক্তির পরিবর্তে দলীয় আনুগত্যের দিকে ঠেলে দেয়।
মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের বক্তব্য নিয়েও এমন প্রবণতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্যের পক্ষে যাঁরা অবস্থান নেবেন, তাঁদের উচিত প্রাসঙ্গিক দলিল ও যুক্তি উপস্থাপন করা। যাঁরা দ্বিমত পোষণ করবেন, তাঁদেরও উচিত বক্তব্যের নির্দিষ্ট অংশ ও যুক্তি ধরে সমালোচনা করা। কারও ব্যক্তিগত মর্যাদা নষ্ট করা কিংবা তাঁকে নিয়ে বিদ্বেষ ছড়ানো কোনো পক্ষেরই কাম্য হতে পারে না।
একই সঙ্গে আলেমদেরও জনপরিসরে সংবেদনশীল রাজনৈতিক বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে শব্দচয়ন, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং তার সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন। ধর্মীয় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব—উভয় ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীলতার মানদণ্ড থাকা জরুরি।
শেষ কথা: সত্যের পক্ষে থাকুন, শালীনতার সীমা অতিক্রম করবেন না
বাংলাদেশের মানুষ আজ এমন একটি সামাজিক পরিবেশ প্রত্যাশা করে, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার মর্যাদা থাকবে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে কেউ অযথা অপমানের শিকার হবেন না।
মুফতি আব্দুল মালেক সাহেবের বক্তব্যের মূল্যায়ন হোক তাঁর বক্তব্য, যুক্তি ও প্রমাণের আলোকে। জামায়াতে ইসলামীসহ যেকোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শ ও ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হোক তথ্যের ভিত্তিতে। আর আলেমদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা আপত্তি থাকলে তা প্রকাশ করা হোক শালীন ভাষায়, দায়িত্বশীলভাবে এবং যথাযথ প্রমাণসহ।
কাউকে অন্ধভাবে সমর্থন করা যেমন জ্ঞানচর্চার পথ নয়, তেমনি গালিগালাজ করে কাউকে পরাজিত করার চেষ্টাও যুক্তির পথ নয়। মতবিরোধ থাকতেই পারে; কিন্তু সেই মতবিরোধ যেন আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধকে গ্রাস না করে।
আমরা মনে করি, আলেমের বক্তব্যের জবাব গালিগালাজ নয়—দলিল, যুক্তি ও প্রজ্ঞা। সত্যের অনুসন্ধান হোক, কিন্তু শালীনতা বিসর্জন দিয়ে নয়।
— মাহের আহমেদ
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক যখন সময়
সত্য প্রকাশে বদ্ধ পরিকর





























