বছরে ৩৫ হাজার কোটি টাকার ভোজ্যতেল আমদানি, উপেক্ষিত দেশি রাইস ব্র্যান
- আপডেট সময় : ১০:৩২:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে প্রতিবছর ভোজ্যতেলের বিশাল চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই মেটানো হচ্ছে বিদেশ থেকে আমদানি করা সয়াবিন ও পাম তেল দিয়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই বিপুল চাহিদার বিপরীতে কাঁচামাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারেনি। এর ফলে প্রতিবছর দেশের একটি বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে আমদানির পেছনে। অথচ দেশে উৎপাদিত ধানের কুঁড়া থেকে বছরে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টন স্বাস্থ্যকর ‘রাইস ব্র্যান অয়েল’ উৎপাদনের সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে, যা গত দেড় দশকেও সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেনি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সদ্যবিদায়ী অর্থবছরে ২২ লাখ ২৩ হাজার টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ যোগ করলে মোট আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকায়। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন সয়াবিন ও পাম তেল আমদানিতে খরচ হয়েছিল প্রায় ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা, যা শুল্ক ও ভ্যাটসহ মোট প্রায় ৩৪ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দেশে মানুষের ভোজ্যতেল গ্রহণের হার ক্রমাগত বাড়ছে। ২০১৬ সালে যেখানে দৈনিক মাথাপিছু ভোজ্যতেল গ্রহণের হার ছিল প্রায় ২৭ গ্রাম, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ গ্রামে।
আমদানিনির্ভর এই চাহিদার বড় অংশই পূরণ করছে বাজারে বহুল ব্যবহৃত ডাবল রিফাইনড বা ফর্টিফাইড সয়াবিন তেল, যা সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের খাবার পর্যন্ত সব ধরনের রান্নায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। তবে এই তেলের মান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সয়াবিন তেল যত বেশি স্বচ্ছ ও পাতলা দেখায়, তা তত বেশি রাসায়নিক প্রক্রিয়াজাতকরণের মধ্য দিয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ২০২১ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন কোম্পানির বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রায় ৬৭ শতাংশ নমুনায় সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি ক্ষতিকর ‘ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিড’ বা ট্রান্সফ্যাট রয়েছে।
এই গবেষণা দলের প্রধান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক নাজমা শাহিন (এলপিআর) বলেন, সয়াবিন তেলের মান নিয়ে গবেষণায় যে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে, তা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী সরকার ভোজ্যতেলে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। তেল উৎপাদনের সময় নজরদারি ও তদারকি জোরদার করলে এই ক্ষতিকর উপাদানের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ২০২১ সালে ‘খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা’ প্রণয়ন করে, যা ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও বাজারে থাকা সয়াবিন তেলের নমুনায় এর চেয়ে দুই থেকে চারগুণ বেশি ট্রান্সফ্যাট পাওয়া গেছে। এছাড়া বাসাবাড়ি বা রেস্তোরাঁয় একই তেল বারবার গরম করে ব্যবহারের ফলেও ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, ট্রান্সফ্যাট রক্তের উপকারী এইচডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই ক্ষতিকর কোলেস্টেরল রক্তনালীতে জমা হয়ে ব্লক তৈরি করে, যা সরাসরি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিবিএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ ২৪ হাজার মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন, যা বর্তমানে দেশে অকাল মৃত্যুর সবচেয়ে বড় একক কারণ। সয়াবিন তেলের অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর ২ লাখ ৫ হাজারের বেশি মানুষ হৃদরোগে মারা যান, যা দৈনিক গড়ে ৫৬২ জন। গবেষকদের সতর্কবার্তা, সয়াবিন তেল পরিশোধন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পোড়া তেলের পুনরায় ব্যবহার বন্ধ না করা গেলে এই মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব নয়।
এই পরিস্থিতির বিপরীতে রাইস ব্র্যান অয়েল দেশের ভোজ্যতেলের বাজারে একটি বড় এবং স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মানদণ্ড অনুযায়ী, ধানের কুঁড়া থেকে তৈরি এই তেলে স্যাচুরেটেড, মনো-আনস্যাচুরেটেড ও পলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের চমৎকার ভারসাম্য বজায় থাকে। ট্রান্সফ্যাটমুক্ত এবং ভিটামিন-ই কমপ্লেক্স, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও গামা-ওরিজানল সমৃদ্ধ এই তেলকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ওষুধের বিকল্প খাদ্য’ বা নিউট্রাসিউটিক্যাল হিসেবে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশ শিল্প ও বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদের (বিসিএসআইআর) মতে, অলিভ অয়েলের পরেই এই তেলের পুষ্টিগুণ সবচেয়ে বেশি। নিউ ইয়র্কের রোচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, এটি ক্যানসার প্রতিরোধ ও মেদ নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। হালকা স্বাদের এই তেল রান্নার সময় অন্যান্য তেলের চেয়ে ২০ শতাংশ কম শোষিত হয়, ফলে খাবারে ক্যালরিও কম থাকে।
সম্প্রতি সরকারি পর্যায়ে রাইস ব্র্যান অয়েলের ব্যবহার ও চাহিদা বাড়ছে। চলতি বছর সরকার ও টিসিবির জন্য একাধিক দফায় এই তেল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত মে মাসে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ১৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ কোটি লিটার পরিশোধিত রাইস ব্র্যান অয়েল কেনার অনুমোদন দেয়। এর আগে মার্চেও বড় আকারে তেল কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া জুলাই মাসের এক প্রতিবেদনে ১ কোটি ৮০ লাখ লিটার রাইস ব্র্যান অয়েল সংগ্রহের সরকারি সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়। সরকারি এই ক্রয়ের ফলে পণ্যটির একটি নিশ্চিত বাজার তৈরি হলেও সাধারণ ভোক্তাদের খুচরা বাজারে স্থায়ী চাহিদা তৈরি না হওয়ায় উৎপাদকরা বড় পরিসরে উৎপাদনে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে পারছেন না। এর ফলে রাইস ব্র্যান অয়েল তৈরির কারখানাগুলোর বড় অংশের উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাইস ব্র্যান অয়েলের এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রথমে ধানের কুঁড়া বা কাঁচামাল সংগ্রহের একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। এরপর কারখানার উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার, উৎপাদন খরচ কমানো, ছোট আকারের প্যাকেটের সরবরাহ বাড়ানো এবং খুচরা বাজারে এর সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, বৈজ্ঞানিক ও সঠিক তথ্য প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ ভোক্তার আস্থা অর্জন করা। দেশের কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সয়াবিন তেলের স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে রাইস ব্র্যান অয়েলের বাজার সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
প্রকাশ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৪১আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯: ৪২



























