শিল্পের গ্যাস বিদ্যুতে স্থানান্তর: সংকটে উৎপাদন, বিকল্প আছে কি?
- আপডেট সময় : ০৮:৫০:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

তীব্র বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় শিল্প খাতের বরাদ্দ থেকে ২০ থেকে ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরিয়ে বিদ্যুৎ খাতে দেওয়ার ফলে দেশের শিল্পকারখানাগুলো মারাত্মক সংকটের মুখে পড়েছে। লোডশেডিং কমাতে গত ১৩ আগস্ট থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ দৈনিক গ্যাস বরাদ্দ ৭২ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৯৫ কোটি ঘনফুটে উন্নীত করে, যার প্রভাব পড়েছে শিল্প উৎপাদনে। গত ১৫ দিন ধরে শত শত কারখানা চাহিদামতো গ্যাস না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা শ্রমিকদের জীবিকাকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
তিতাস গ্যাস কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, গ্যাসের অভাবে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে না পারার বিষয়ে অসংখ্য শিল্পমালিক অভিযোগ করছেন, যদিও তাদের কাছে বর্তমানে কোনো সুরাহা নেই। বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত সারা দেশে ২১৯ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ কোটি ঘনফুট বিদ্যুৎ খাতে, ২০ কোটি সার কারখানায় এবং ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুট শিল্পকারখানার জন্য বরাদ্দ ছিল। বাকি গ্যাস সিএনজি স্টেশন, বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক গ্রাহকদের দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ১০ আগস্ট বিদ্যুৎ খাতে গড়ে ৬৬ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট গ্যাস বরাদ্দ ছিল। পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবির হিসাব অনুযায়ী, ওইদিন সন্ধ্যা ৭টায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় ৪ হাজার ১৫৭ মেগাওয়াট। ১২ আগস্ট থেকে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৭২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট করা হলে ওইদিন বিকাল ৪টায় সর্বনিম্ন ৩ হাজার ৯৫৬ মেগাওয়াট এবং রাত ৯টায় সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৪২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। পরবর্তীতে ১৪ আগস্ট ৯৩ কোটি ১০ লাখ, ১৭ আগস্ট ৯৩ কোটি ৮০ লাখ, ১৮ আগস্ট ৯৩ কোটি ২০ লাখ এবং ১৯ আগস্ট ৯২ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই গ্যাস ব্যবহার করে ১৪ আগস্ট সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২০১ মেগাওয়াট, ১৮ আগস্ট সকালে ৫ হাজার ৪২৪ মেগাওয়াট এবং ১৯ আগস্ট বিকাল ৫টায় ৫ হাজার ২০২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। অর্থাৎ ২০ থেকে ২২ কোটি ঘনফুট গ্যাস বেশি পেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। পিডিবি জানিয়েছে, মূলত আশুগঞ্জ দক্ষিণ ও পূর্ব ইউনিট, শাহজীবাজার ৩৩০ মেগাওয়াটের একটি ইউনিট এবং মেঘনাঘাট কেন্দ্রসহ কয়েকটি কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক এম তামিম বলেন, শিল্পের ক্ষতি করে এই গ্যাস স্থানান্তর না করে দৈনিক ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা খরচ করে ফার্নেস অয়েলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো উচিত ছিল। বর্তমানে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও সেগুলো অলস বসে আছে। ১৯ আগস্ট রাত ১১টায় ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে ৩ হাজার ১৫৭ মেগাওয়াট এবং বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় ১ হাজার ৯৫৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিদিন ৫৪ লাখ ৪০ হাজার লিটার ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করলে শিল্পের গ্যাস না কমিয়েই সমপরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এলএনজি সরবরাহ অব্যাহত রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে এলএনজি কার্গোর অভাবে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল এক সপ্তাহ ধরে অলস বসে থাকার বিষয়টি উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী শিল্প খাতের এই সংকট সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। এর আগে ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই সারা দেশে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে।
এমনিতেই গ্যাস সংকটে দেশের শত শত শিল্পকারখানা বন্ধের উপক্রম। তারপরও লোডশেডিং সামাল দেওয়ার নামে শিল্প খাতের বরাদ্দ থেকে ২০-২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস বিদ্যুৎ খাতে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে শিল্প খাত মারাত্মক সংকটে পড়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, শিল্পকারখানাকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোর পথ আছে। দৈনিক ৫৪ থেকে ৬০ কোটি টাকার ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়ালেই শিল্পের জন্য বরাদ্দ গ্যাস কমানের প্রয়োজন হতো না।





























