ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বড় ধস বাংলাদেশের

- আপডেট সময় : ০৯:১২:৩০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাকের বাজারে বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) ইইউ-এর বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের সার্বিক চাহিদা ও দাম হ্রাসের যে গড় হার, বাংলাদেশের পতনের চিত্র তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ তীব্র।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো কোনো না কোনো কৌশল অবলম্বন করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখলেও বাংলাদেশই একমাত্র বড় সরবরাহকারী দেশ, যেখানে একইসঙ্গে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ (ভলিউম) এবং দর (প্রাইস) উভয়ই কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করে রপ্তানির এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
রপ্তানিকারকদের মতে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের মূল চালিকাশক্তি ছিল তুলনামূলক সস্তা দরে পণ্য সরবরাহ করা। কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তান ও চীনের আগ্রাসী মূল্যছাড়ের কৌশলের কারণে বাংলাদেশ সেই সুবিধাজনক অবস্থান হারাচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ তার দরকষাকষির সক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে বিশ্ববাজার থেকে ইইউ-এর সার্বিক পোশাক আমদানি কমেছে ৯.৯৬ শতাংশ। এ সময়ে ইইউ-এর আমদানি ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ইউরো থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ৩৩.৮৪ বিলিয়ন ইউরোতে। মূলত ইউরোপের বাজারে পোশাকের সার্বিক চাহিদা কমে যাওয়া (ভলিউম হ্রাস ৬.৪৬%) এবং পণ্যের গড় দাম কমে যাওয়া (ইউনিট প্রাইস হ্রাস ৩.৭৪%)—এই দুই কারণে বাজারে সামগ্রিক মন্দা দেখা দিয়েছে।
তবে বৈশ্বিক এই মন্দার ধাক্কা বাংলাদেশের গায়ে লেগেছে সবচেয়ে তীব্রভাবে। এই পাঁচ মাসে ইইউ-এর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১৮.৮৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৭.২৮ বিলিয়ন ইউরোতে। বিশ্ববাজারের গড় হ্রাসের তুলনায় বাংলাদেশ প্রায় দ্বিগুণ ধাক্কা খেয়েছে। এই সময়ে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ (ভলিউম) কমেছে ১০.৪৬ শতাংশ এবং পোশাকের গড় দাম কমেছে ৯.৪১ শতাংশ। একক মাস হিসেবে মে মাসেও এই নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত ছিল। মে মাসে মূল্য কমেছে ১৭.১২ শতাংশ এবং ভলিউম কমেছে ১৩.৫৫ শতাংশ।
এপ্রিলের পর মে মাসেও এই দ্বিমুখী পতন অব্যাহত থাকায় তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তা ও বিশ্লেষকরা বেশ উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ যখন একইসঙ্গে দাম ও পণ্যের পরিমাণ—দুই ফ্রন্টেই বাজার হারাচ্ছে, তখন প্রতিযোগী দেশগুলো ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে বাজার সামাল দিচ্ছে। ভিয়েতনামের রপ্তানি ভলিউম কমলেও তারা বেশি দাম আদায় করতে পারছে, আর চীন কম দামে বেশি ভলিউম সরবরাহ করে বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখছে।
প্রতিযোগী দেশগুলোর বাজারচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে কম হ্রাস পেয়েছে চীনের রপ্তানি (-৪.২০%)। ইইউ-এর বাজারে একমাত্র চীনই পোশাক সরবরাহের পরিমাণ বা ভলিউম ১.৯৬ শতাংশ বাড়াতে পেরেছে। মূলত পোশাকের দাম ৬.০৫ শতাংশ কমিয়ে তারা বাজার ধরে রাখার কৌশল নিয়েছে। বাজারে সবচেয়ে বেশি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে ভিয়েতনাম। তাদের রপ্তানি কমেছে মাত্র ১.৫১ শতাংশ। ভিয়েতনামের পোশাক রপ্তানির ভলিউম ১২.২৭ শতাংশ কমলেও প্রিমিয়াম পণ্য সরবরাহ করায় পোশাকের গড় দাম বেড়েছে ১২.২৬ শতাংশ। ফলে তারা মূল্যের দিক থেকে বড় ক্ষতি এড়াতে পেরেছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের পোশাক রপ্তানি আয় ১৭.০১ শতাংশ কমলেও তাদের ভলিউম বেড়েছে ৩ শতাংশ। মূলত পণ্যের নজিরবিহীন দরপতনের (-১৯.৪৩%) কারণেই পাকিস্তানের সামগ্রিক আয় কমেছে। তুরস্ক ও কম্বোডিয়া—এই দুই দেশের পোশাক সরবরাহের পরিমাণ কমলেও (যথাক্রমে -১৭.১৭% ও -১৫.১৩%) পোশাকের গড় দাম বেড়েছে। ভারতের রপ্তানি কমেছে ১৩.৩৩ শতাংশ। দেশটির চিত্রও বাংলাদেশের মতো দ্বিমুখী দুর্বলতার হলেও পতনের তীব্রতা বাংলাদেশের চেয়ে কম। পোশাক সরবরাহের পরিমাণে সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে ইন্দোনেশিয়ায় (-২৩.৭৬%)।
তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল এ প্রসঙ্গে বলেন, গত কয়েক মাস ধরে আমাদের উৎপাদন খরচ যেভাবে বেড়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ক্রেতারা দাম দিচ্ছেন না। উল্টো প্রতিযোগী দেশগুলো দাম কমিয়ে আমাদের অর্ডার নিয়ে যাচ্ছে। আমরা যদি দ্রুত পণ্য বহুমুখীকরণ এবং উচ্চমূল্যের পোশাকের (ভ্যালু অ্যাডেড প্রোডাক্ট) দিকে না যাই, তবে ইউরোপের এই বাজারে আমাদের হিস্যা আরও সংকুচিত হবে।




























