ঢাকা ১১:১৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বাজেটের সফল বাস্তবায়নই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: অর্থমন্ত্রী মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের রূপান্তর: বাংলাদেশের জন্য বড় সতর্কবার্তা বাংলাদেশসহ ৬০ দেশের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করল ট্রাম্প প্রশাসন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে মধ্যরাতে ভিডিও বার্তা দিলেন মোদি বিশ্বকাপের অবৈধ সম্প্রচার রোধে ৩ হাজার ওয়েবসাইট বন্ধ মাতামুহুরী কলেজের জমি দখলের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন কক্সবাজারে ল্যান্ড ক্রুজারে ২৮ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ১ টিভিতে আজ যেসব খেলা দেখবেন, জেনে নিন সময়সূচি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসর নিলেন অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার ওটামেন্ডি অর্থনৈতিক চাপ ও আইএমএফের সতর্কতায় আটকে আছে নতুন পে স্কেল

বন্যা কমতেই বেরিয়ে আসছে ক্ষত, অনিশ্চিত জনজীবন

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৯:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

বন্যার পানি নামতে শুরু করলে সাধারণত মানুষের মনে সাময়িক স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পানি কমার পরই প্রকৃত দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। তখন দৃশ্যমান হয় ভাঙা ঘর, বিধ্বস্ত সড়ক, নষ্ট ফসল, হারিয়ে যাওয়া জীবিকা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এবারের বন্যাও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় কোথাও নদীর পানি বাড়ছে, কোথাও কমছে। কিন্তু প্রায় সর্বত্রই প্রকাশ পাচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির গভীর চিত্র, যা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, আমাদের দুর্বল প্রস্তুতি ও অব্যবস্থাপনাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও অসংখ্য বসতবাড়ি। আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে, ভেসে গেছে মাছের খামার। কৃষিনির্ভর মানুষের জন্য এটি কেবল তাৎক্ষণিক ক্ষতি নয়, আগামী মৌসুমের খাদ্য উৎপাদন ও আয়ের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। একই সময়ে লালমনিরহাটে তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের জলকপাট খুলে রাখতে হয়েছে।

সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধ ধসে পড়ার ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, নদী ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সমাধান এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। রংপুরের যমুনেশ্বরী নদীর অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি এবং নদীভাঙনের আশঙ্কা স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে মেঘনা নদীর ভাঙনে শতাধিক পরিবার গৃহহীন হওয়ার পথে। নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি পুরনো বাস্তবতা হলেও এর স্থায়ী প্রতিকার আজও অধরাই রয়ে গেছে।

মৌলভীবাজারের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বন্যায় জেলার শতাধিক কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০ কোটি টাকা। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়লে শুধু মানুষের চলাচল নয়, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনকে শুধু ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; দ্রুত অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং জীবিকা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রতিবছরই একই ধরনের দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—কেন আমরা এখনও বন্যাকে শুধু মৌসুমি ঘটনা হিসেবেই দেখি? জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলেছে, উজানের ঢল বেড়েছে, নদীর গতি-প্রকৃতিতেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রচলিত পদ্ধতি আর যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা, কার্যকর বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, নদী খনন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ।

বন্যার সময় সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যেন কেবল তাৎক্ষণিক তৎপরতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে দ্রুত পুনর্বাসন, কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা এবং নদীভাঙনে গৃহহারা মানুষের স্থায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা জরুরি। বাংলাদেশের মানুষ দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রতিবছর একই ক্ষয়ক্ষতি মেনে নেওয়া কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য কাম্য হতে পারে না। দুর্যোগকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে না দিয়ে পরিকল্পিত প্রস্তুতি, টেকসই অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বন্যার পানি একসময় নেমে যাবে, কিন্তু যদি রাষ্ট্রের প্রস্তুতি ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি না কমে, তবে মানুষের দুর্ভোগ কখনই শেষ হবে না। এখনই সময় ক্ষতচিহ্নগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন পদক্ষেপ গ্রহণের, যাতে আগামী বর্ষায় একই বেদনার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Dainik Amader Shomoy

নিউজটি শেয়ার করুন

বন্যা কমতেই বেরিয়ে আসছে ক্ষত, অনিশ্চিত জনজীবন

আপডেট সময় : ০৯:৪৯:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
print news

বন্যার পানি নামতে শুরু করলে সাধারণত মানুষের মনে সাময়িক স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পানি কমার পরই প্রকৃত দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। তখন দৃশ্যমান হয় ভাঙা ঘর, বিধ্বস্ত সড়ক, নষ্ট ফসল, হারিয়ে যাওয়া জীবিকা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এবারের বন্যাও তার ব্যতিক্রম নয়। দেশের বিভিন্ন জেলায় কোথাও নদীর পানি বাড়ছে, কোথাও কমছে। কিন্তু প্রায় সর্বত্রই প্রকাশ পাচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির গভীর চিত্র, যা শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, আমাদের দুর্বল প্রস্তুতি ও অব্যবস্থাপনাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

নেত্রকোনার কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে বন্যার পানি নামতে শুরু করলেও মানুষের দুর্ভোগ শেষ হয়নি। পাহাড়ি ঢলে ভেঙে গেছে সড়ক, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও অসংখ্য বসতবাড়ি। আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে, ভেসে গেছে মাছের খামার। কৃষিনির্ভর মানুষের জন্য এটি কেবল তাৎক্ষণিক ক্ষতি নয়, আগামী মৌসুমের খাদ্য উৎপাদন ও আয়ের ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে। একই সময়ে লালমনিরহাটে তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছে নিম্নাঞ্চলে নতুন করে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যারাজের জলকপাট খুলে রাখতে হয়েছে।

সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধ ধসে পড়ার ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, নদী ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সমাধান এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। রংপুরের যমুনেশ্বরী নদীর অস্বাভাবিক পানি বৃদ্ধি এবং নদীভাঙনের আশঙ্কা স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে মেঘনা নদীর ভাঙনে শতাধিক পরিবার গৃহহীন হওয়ার পথে। নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি পুরনো বাস্তবতা হলেও এর স্থায়ী প্রতিকার আজও অধরাই রয়ে গেছে।

মৌলভীবাজারের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বন্যায় জেলার শতাধিক কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০ কোটি টাকা। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়লে শুধু মানুষের চলাচল নয়, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় অর্থনীতিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনকে শুধু ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; দ্রুত অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং জীবিকা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রতিবছরই একই ধরনের দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—কেন আমরা এখনও বন্যাকে শুধু মৌসুমি ঘটনা হিসেবেই দেখি? জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলেছে, উজানের ঢল বেড়েছে, নদীর গতি-প্রকৃতিতেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রচলিত পদ্ধতি আর যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা, কার্যকর বাঁধ রক্ষণাবেক্ষণ, নদী খনন, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ।

বন্যার সময় সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যেন কেবল তাৎক্ষণিক তৎপরতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। ক্ষয়ক্ষতির সঠিক মূল্যায়ন করে দ্রুত পুনর্বাসন, কৃষকদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক সহায়তা এবং নদীভাঙনে গৃহহারা মানুষের স্থায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা জরুরি। বাংলাদেশের মানুষ দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করতে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রতিবছর একই ক্ষয়ক্ষতি মেনে নেওয়া কোনো সভ্য রাষ্ট্রের জন্য কাম্য হতে পারে না। দুর্যোগকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে না দিয়ে পরিকল্পিত প্রস্তুতি, টেকসই অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বন্যার পানি একসময় নেমে যাবে, কিন্তু যদি রাষ্ট্রের প্রস্তুতি ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি না কমে, তবে মানুষের দুর্ভোগ কখনই শেষ হবে না। এখনই সময় ক্ষতচিহ্নগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন পদক্ষেপ গ্রহণের, যাতে আগামী বর্ষায় একই বেদনার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Dainik Amader Shomoy