বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাতের ওপর অত্যধিক নির্ভরতা উদ্বেগের কারণ

- আপডেট সময় : ০৮:৪০:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারের ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা ক্রমশ বাড়ছে, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকার নিট ঋণ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৪ হাজার ৬০৬ কোটি টাকাই সংগৃহীত হয়েছে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে। অর্থাৎ, মোট অভ্যন্তরীণ ঋণের ৯৯ শতাংশেরও বেশি এখন ব্যাংক খাতনির্ভর। বিপরীতে সঞ্চয়পত্র, বীমা কোম্পানি ও অন্যান্য বিকল্প উৎস থেকে এসেছে মাত্র ৭৬৮ কোটি টাকা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি সিকিউরিটিজের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও, যখন এই নির্ভরতা অত্যধিক হয়ে পড়ে তখন তা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যাংকের আমানতের একটি বড় অংশ সরকার ব্যবহার করলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে, যাকে অর্থনীতিবিদরা 'ক্রাউডিং আউট' প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করেন। বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা তুলনামূলক কম থাকলেও, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে এগোলে এই পরিস্থিতি শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের এই ব্যাংকনির্ভরতার পেছনে বেশ কিছু কারণ দৃশ্যমান। প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হওয়া, কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় কম থাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও বাজেট সহায়তা প্রত্যাশা অনুযায়ী না পাওয়া এর মূল কারণ। এছাড়া সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ও নীতিমালায় পরিবর্তন এবং অনলাইন যাচাই-বাছাইয়ের মতো বিধিনিষেধের কারণে এ খাত থেকে অর্থ প্রবাহ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বন্ধ করা সমাধান নয়, বরং অর্থায়নের উৎসে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা জরুরি। রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং কর ফাঁকি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর হতে হবে। সঞ্চয়পত্রকে পুনরায় কার্যকর বিনিয়োগ মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা, দীর্ঘমেয়াদী বন্ড, সুকুক এবং পেনশন ও বীমা তহবিলের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি বৈদেশিক উন্নয়ন সহযোগিতা ও স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ পাওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সুশাসন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ সবসময় নেতিবাচক নয়, যদি তা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু যখন ঋণের বড় অংশ চলতি ব্যয় মেটাতে খরচ হয় এবং অর্থায়নের উৎস একমুখী হয়ে পড়ে, তখন তা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। টেকসই অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্যে রাজস্ব সংস্কার ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ঋণ কাঠামো গড়ে তোলাই বর্তমান সময়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ।





























