স্থলপথে ভারতে রপ্তানি বন্ধে সংকটে পাবনার ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারিশিল্প
- আপডেট সময় : ১১:৪৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬ ২২ বার পড়া হয়েছে

পাবনার ঐতিহ্যবাহী হোসিয়ারিশিল্প এখন চরম সংকটের মুখে। স্থলপথে ভারতে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জেলার প্রায় তিন হাজার হোসিয়ারি কারখানার মালিক ও শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছেন। জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, এই শিল্পের সাথে জড়িত প্রায় ৬৫ শতাংশ শ্রমিক এখন বেকার হয়ে পড়েছেন। কারখানাগুলো পণ্য বিক্রি করতে না পেরে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
পাবনা শহরের সাধুপাড়া মহল্লার ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন জানান, তিনি ব্যাংক ঋণ নিয়ে কারখানা গড়ে প্রায় ৪০০ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিলেন। রপ্তানি বন্ধের পর উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পেরে কারখানাটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং বর্তমানে দেনার দায়ে দেউলিয়া হওয়ার পথে। জেলা হোসিয়ারি ম্যানুফ্যাকচারার্স গ্রুপের সভাপতি সেলিম সরদার জানান, দেশের মোট হোসিয়ারি পণ্যের ৬৫ শতাংশ পাবনা থেকে রপ্তানি হতো। বর্তমানে মালিকদের প্রতিদিন পাওনাদারদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় ২০০ বছর আগে পাবনায় এই শিল্পের গোড়াপত্তন হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর শিল্পটি বড় ধাক্কা খায় এবং ১৯৭২ সালের দিকে প্রায় মুখ থুবড়ে পড়ে। পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের দিকে ঝুট কাপড়ভিত্তিক পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্পটি পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায়। আগে প্রতি সপ্তাহে শতাধিক ট্রাক পণ্য ভারতে যেত, যা থেকে দেড় থেকে দুই লাখ মার্কিন ডলার আয় হতো। বর্তমানে স্থলপথ বন্ধ থাকায় নৌপথে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে, যা ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ। নৌপথে পণ্য পাঠালে মূল্য পেতে ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগছে, যেখানে আগে পাঁচ দিনের মধ্যেই টাকা পাওয়া যেত।
দ্বীপচরের ব্যবসায়ী মিরাজুল ইসলাম জানান, তাঁর উৎপাদিত পণ্যের দুই-তৃতীয়াংশ ভারতে রপ্তানি হতো। রপ্তানি বন্ধের কারণে বর্তমানে কোনো আয় নেই এবং ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। সাধুপাড়ার এসবি রয়েল গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক মো. আশিক হোসেন জানান, আগে কাজের চাপে দম ফেলার সময় না থাকলেও এখন কর্মীর সংখ্যা ৩০ থেকে কমিয়ে সাতজনে নামিয়ে আনা হয়েছে। জনি গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপক কামরুল হাসান জানান, তাদের কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ৫০০ থেকে কমে ২০০ জনে নেমেছে।
পাবনা শহরের সাধুপাড়া, বাংলাবাজার ও দিলালপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় কারখানাগুলোর গুদাম ও শোরুমে উৎপাদিত পণ্যের মজুত পড়ে আছে। ঝুটপল্লির ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, দেড় বছর ধরে বিক্রি নেই, কাপড় বাছাইয়ের ১৫ জন কর্মীর মধ্যে ১০ জনকে ছাঁটাই করতে হয়েছে। একই এলাকার ব্যবসায়ী ফারুক হোসেন জানান, ব্যাংক ও এনজিওর ঋণের বোঝা নিয়ে সবাই বড় সংকটে পড়েছেন। এছাড়া এ আর কর্নারের তরুণ দাস জানান, কাজ না থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক এ বি এম ফজলুর রহমান এই সংকট নিরসনে সরকারের সদিচ্ছা ও দ্রুত স্থলপথে আমদানি-রপ্তানি চালুর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পাবনার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।





























