অবশেষে বৈধতা পাচ্ছে ঢাকা জেলা পরিষদের অবৈধ ২০ তলা ভবন
- আপডেট সময় : ০৫:৫৯:১৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬ ০ বার পড়া হয়েছে

পুরান ঢাকায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নির্মিত ঢাকা জেলা পরিষদের ২০ তলা ভবনটি অবশেষে বৈধতা পেতে যাচ্ছে। ২০১১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই বহুতল ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৭ সালে নির্মাণ প্রক্রিয়ায় অবৈধ ও অনিয়মতান্ত্রিক বিষয়গুলো সামনে এলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এর কার্যক্রম স্থগিত করে দেয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই বড় অনিয়মের কোনো সুরাহা না করেই নতুন করে জেলা পরিষদের এই প্রশাসন ভবনটি চালু করার তোড়জোড় শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
রাজধানীতে যেকোনো বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। এজন্য জমির মালিকানাসংক্রান্ত যাবতীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। এরপর ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ)-এর নির্দেশনা অনুযায়ী নকশা প্রণয়ন করে তা রাজউক থেকে অনুমোদন করাতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় স্ট্রাকচারাল ডিজাইন, সয়েল টেস্ট, সাইট প্ল্যান, ফ্লোর প্ল্যান, ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) ও সেট ব্যাকের নিয়মগুলো কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস এবং পরিবহণ সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র নেওয়াও বাধ্যতামূলক। তবে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে নির্মিত এই ২০ তলা ভবনের ক্ষেত্রে এসব গুরুত্বপূর্ণ শর্তের কোনোটিই প্রতিপালন করা হয়নি বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
পুরান ঢাকার ঢাকা জজকোর্ট সংলগ্ন সড়কের উল্টো দিকে এক বিঘার বেশি জায়গার ওপর এই ভবনটি গড়ে তোলা হয়েছে। এর নির্মাণ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া নিয়ে বিপুল অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য, দোকান বরাদ্দ ও নিম্নমানের নির্মাণকাজের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ২০১৭ সালে ভবনটির কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে এর সব ফাইলপত্র গায়েব হয়ে যায়। তৎকালীন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে এই ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি গায়েব হওয়া ফাইলের সুরাহা না করেই ভবনটি চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
এই বিষয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান জানান, সরকারি কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান আইন অমান্য করলে তাদের ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বরং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। রাজউক যদি এক্ষেত্রে কঠোর ভূমিকা পালন না করে, তবে মানুষ এই সংস্থাকে অবমূল্যায়ন করবে। এ ধরনের অনিয়ম প্রশ্রয় দেওয়ার কারণেই রাজউক আজ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এত বড় একটি ভবন কোনো অনুমোদন ছাড়া তৈরি হওয়ার সময় রাজউক কোথায় ছিল, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তবে ঢাকা জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম জানান, কর্তৃপক্ষ ভবনটি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে যৌথ জরিপ, কারিগরি যাচাই এবং পুনঃদরপত্রের কাজ শুরু হয়েছে। রাজউক থেকে ভূমি ব্যবহারের ছাড়পত্র পাওয়া গেছে এবং বাকি প্রক্রিয়াগুলোও দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ নূর-ই-খোদা এই বিষয়ে বলেন, ভবনটি নির্মাণে শতকোটি টাকার বেশি খরচ করা হয়েছে, তাই এটি ফেলে রেখে নষ্ট করা ঠিক হবে না। নিয়ম অনুযায়ী নির্মিত ভবনেরও নকশা অনুমোদনের সুযোগ রয়েছে এবং সে লক্ষ্যে তাদের কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, রাজউকের সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াস জানান, তারা ভবনটিকে অবৈধ হিসেবেই জানেন। সরকারি ভবন হওয়ায় হয়তো নির্মাণের সময় রাজউকের তৎকালীন কর্মকর্তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। তাছাড়া অনেক সরকারি ভবনের নকশা প্রধান স্থপতি তৈরি করলে রাজউকের অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গত ১৫ জুলাই ঢাকা জেলা পরিষদ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর নির্মাণাধীন এই বাণিজ্যিক ভবনের পূর্ববর্তী ঠিকাদার মেসার্স তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোং লিমিটেডের সম্পাদিত কাজের যৌথ পরিমাপ ও জরিপ কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ভবনটির টেকনিক্যাল ভেরিফিকেশন ও সার্টিফিকেশনের কাজ শুরু করেছে। তবে এই বিজ্ঞপ্তিতে পূর্বের অনিয়ম, দুর্নীতি বা ফাইল গায়েবের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, ভবনটিতে দুটি বেজমেন্ট, ২০টি ফ্লোর এবং একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম রয়েছে। প্রতিটি তলায় প্রায় ১৫ হাজার বর্গফুট ব্যবহারযোগ্য বাণিজ্যিক স্পেস রয়েছে। একসময় এই স্থানে জেলা পরিষদের নিজস্ব কার্যালয় ছিল, যা বর্তমানে সাময়িকভাবে উত্তরা সেক্টর-৬ থেকে পরিচালিত হচ্ছে। দূরত্বের কারণে সেবাগ্রহীতাদের অসুবিধা হওয়ায় ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ করে দ্রুত জেলা পরিষদের কার্যালয় এখানে স্থানান্তর করা হবে।
সার্বিক বিষয়ে ঢাকা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বদরুদ্দোজা শুভ জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ভবনটি চালু করার কার্যক্রম শুরু করেছেন। সব ধরনের নিয়ম অনুসরণ করেই এখন কাজ চলছে এবং বিগত সময়ের ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হচ্ছে। নতুন করে কোনো অনিয়ম বা নিয়মের ব্যত্যয় ঘটবে না বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।





























