সীমান্ত পেরিয়ে আসছে ভারতীয় চোরাই মোবাইল, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আটক ৫

- আপডেট সময় : ০১:১৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে ভারত থেকে চোরাই ও ছিনতাই হওয়া স্মার্টফোন নিয়মিত বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। ওপার থেকে আনা এসব অবৈধ মুঠোফোন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, কুরিয়ার সার্ভিস ও স্থানীয় দোকানগুলোর সাহায্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে একটি সুসংগঠিত চক্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত তৎপরতা সত্ত্বেও প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অনলাইনভিত্তিক বিক্রির মাধ্যমে এই চক্রের পরিধি দিন দিন বাড়ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পৃথক দুটি অভিযানে ২২টি চোরাই ও অবৈধ ভারতীয় মোবাইল ফোনসহ পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা সীমান্ত এবং সদর মডেল থানার অন্তর্গত মহানন্দা পুরাতন সেতু এলাকায় এই অভিযানগুলো চালানো হয়।
প্রথম অভিযানটি পরিচালনা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৩ বিজিবি)। মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের মাস্তানমোড় এলাকায় মনাকষা বিওপির একটি বিশেষ টহলদল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালায়। সেখানে সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তিকে আটক করে তল্লাশি চালানো হলে তাদের কোমরে লুকানো অবস্থায় ৮টি ভারতীয় মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। এছাড়া তাদের ব্যবহৃত ২টি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন এবং ১টি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। জব্দকৃত এসব মালামালের আনুমানিক বাজারমূল্য ৩ লাখ ২৪ হাজার ৪৮৯ টাকা। এই ঘটনায় শিবগঞ্জ থানায় চোরাচালান আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
একই দিন রাতে দ্বিতীয় অভিযানটি পরিচালনা করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ। শিবগঞ্জ-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের মহানন্দা পুরাতন সেতুর টোলঘর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশিকালে ১২টি চোরাই ভারতীয় মোবাইলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন গোমস্তাপুর উপজেলার নামো কাঞ্চনতলার মো. শাজাহান আলী (২৮), সদর মডেল থানার মহারাজপুর পূর্ব-শেখপাড়ার মো. দেলোয়ার হোসেন (৪০) এবং সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানার সাহেবগঞ্জ নলকা গ্রামের মো. আতাউর রহমান (৩০)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ভারতের মালদহ ও মুর্শিদাবাদসহ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকা থেকে চোরাই ও ব্যবহৃত মোবাইল সংগ্রহ করে বাংলাদেশে নিয়ে আসে চোরাকারবারিরা। এরপর এগুলো সীমান্তবর্তী নিরাপদ ঘাঁটিতে মজুত করা হয়। পরবর্তীতে শিবগঞ্জ, কানসাট, মনাকষা, সাহাপাড়া, রানীহাটি, মহারাজপুর, রামচন্দ্রপুর ও জেলা শহরের মোবাইল মার্কেটসহ বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়। কানসাট, শিবগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের কিছু অসাধু মোবাইল ব্যবসায়ী, সার্ভিসিং সেন্টারের মালিক এবং সীমান্ত চোরাকারবারিরা মিলে এই সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। চক্রের সদস্যরা সীমান্ত থেকে ফোন সংগ্রহ, স্থানীয় বাজারে মজুত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে ক্রেতা খোঁজার কাজ ভাগ করে নিয়েছে।
মাঠপর্যায়ের একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভারত থেকে আসা চোরাই চালানে আইফোন, স্যামসাং, ভিভো, অপো, রেডমি, শাওমি, রিয়েলমি ও ওয়ানপ্লাস ব্র্যান্ডের মোবাইল বেশি থাকে। বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েক হাজার থেকে শুরু করে অন্তত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কম দামে পাওয়ায় অনেকেই ঝুঁকি জেনেও এসব ফোন কেনেন। শিবগঞ্জের এক ক্রেতা জানান, বাজার মূল্যের চেয়ে প্রায় সাত হাজার টাকা কম দিয়ে তিনি একটি ভারতীয় ফোন কিনেছিলেন। কিন্তু ব্যবহারের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় ফোনটি নেটওয়ার্ক হারিয়ে ফেলে। পরবর্তীতে সার্ভিসিং সেন্টারে নিয়ে জানতে পারেন ফোনটির উৎস সন্দেহজনক এবং সেটি আর সচল করা সম্ভব হয়নি।
চোরাই মোবাইল প্রবেশে চোরাকারবারিরা শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা, শাহাবাজপুর, তেলকুপি ও শিকারি বিওপি এলাকা, ভোলাহাট সীমান্ত, আজমতপুর এবং সোনামসজিদ স্থলবন্দর সংলগ্ন অঞ্চলগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। এর আগে গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে তেলকুপি বিওপির ইকবালপুর ও শিকারি বিওপির চামুচা সীমান্তে অভিযান চালিয়ে ২৯টি এবং জুন মাসে ভোলাহাট সীমান্তে পৃথক অভিযানে ১৬টি ভারতীয় মোবাইল ফোন উদ্ধার করে ৫৩ ও ৫৯ বিজিবি। জুলাই মাসে এই তৎপরতা আরও বৃদ্ধি পায়। ৫৩ বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুলাই মাসেই বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে মোট ৬৬টি ভারতীয় মোবাইল ফোন জব্দ এবং তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সীমান্ত দিয়ে চোরাই মোবাইলসহ সব ধরনের পণ্য পাচার রোধে বিজিবির গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে। চোরাচালান প্রতিরোধে সীমান্তে টহল জোরদারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।
একইভাবে ৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন পণ্য দেশে প্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং সীমান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবির এই কার্যক্রম চলমান থাকবে।





























