বিচারহীন পুনর্মিলন কেবল সংঘাতের সাময়িক বিরতি: বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন
- আপডেট সময় : ১২:৫১:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

অপরাধের সুষ্ঠু বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজে রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তা না হলে সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত থেকে যায়। তবে এই পুনর্মিলনকে কখনোই অপরাধীদের বাঁচানোর রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। রাজধানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এর শেষ দিনে ‘ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও জাতীয় পুনর্মিলন’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন।
অধিবেশনে অংশ নিয়ে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, বিশ্বজুড়ে প্রায়ই দেখা যায় পুনর্মিলনের প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়েছে। এর কারণ হলো, রাষ্ট্রীয় সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আইনি শাস্তি থেকে রক্ষা করতে এটিকে একটি রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, বিচারহীন জাতীয় পুনর্মিলন কোনো প্রকৃত শান্তি আনতে পারে না, তা কেবল সংঘাতের মধ্যকার একটি সাময়িক বিরতি মাত্র। কায়সার কামাল দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের (যার কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সঙ্গে রিকনসিলিয়েশনের কোনো সুযোগ নেই।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ডেপুটি স্পিকার জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৬০০ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ১২ থেকে ১৩ শতাংশই ছিল শিশু। এই আপসহীন প্রজন্ম একটি নতুন দেশ গড়ার লক্ষ্যে লড়াই করেছিল, যেখানে সব নাগরিক সমান অধিকার পাবে এবং অপরাধীদের বিচার হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, অপশক্তিগুলো এখন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দেশ-বিদেশের কিছু গোষ্ঠী রিকনসিলিয়েশনের দোহাই দিয়ে তাদের পক্ষে কথা বলছে, যা দেশকে নতুন ও ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। উল্লেখ্য, জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান দলের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে, অন্যদিকে সরকারি তালিকায় শহীদের সংখ্যা ৮৪৩ জন।
অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন নেপাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারনেশনাল কো-অপারেশন অ্যান্ড এনগেজমেন্টের গবেষণা পরিচালক প্রমোদ জয়সওয়াল। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার অবশ্যই প্রয়োজন, তবে রিকনসিলিয়েশন না হলে সমাজ বিভক্ত থেকে যায়। তিনি আরও যোগ করেন, দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ সমাজে জবাবদিহিকে প্রতিশোধের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, যা ঠিক নয়। রিকনসিলিয়েশন মানে অতীত নিয়ে সম্পূর্ণ একমত হওয়া বা গুরুতর অপরাধকে ক্ষমা করে দেওয়া নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে সব সম্প্রদায় মর্যাদার সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে।
অনুষ্ঠানে ভারতের রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কারোরি সিং বলেন, প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যখন স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেন, তখনই সমস্যার সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে এই স্বেচ্ছাচারিতাই মূল সংকট তৈরি করছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার উইটস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাদালিৎসো জিলিলো ফিরি তাঁদের দেশের ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এই কমিশন একটি নতুন সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত ছিল। তবে এটি নিয়ে অনেক সমালোচনাও রয়েছে, কারণ উদারনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্যের সব প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি।
কম্বোডিয়ার সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক নিকি সিঙ্গার জানান, তাঁদের দেশে ১৯৯১ সালের আগেই রিকনসিলিয়েশনের কাজ শুরু হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে জাতীয় রিকনসিলিয়েশনের আওতায় খেমার রুজ বিদ্রোহী সৈন্যদের নিরস্ত্রীকরণ করে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি বলেন, কম্বোডিয়ার মানুষ মনে করেন, কেবল অতীতের দোষারোপের ওপর মনোযোগ দিলে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন ঐতিহ্য রেখে যাওয়া হচ্ছে, তা ভাবা জরুরি।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীর বলেন, ১৯৭১ সালের অপরাধীরা এখনো নিজেদের অপরাধ স্বীকার করতে প্রস্তুত নন, বরং তারা মানবতার বিরুদ্ধে নিজেদের কর্মকাণ্ডের যৌক্তিকতা প্রমাণে তৎপর। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতরত পক্ষগুলোর মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থান দেখা যায়। এমনকি ২০২৪ সালে গণতন্ত্রকামী আন্দোলনকারীদের যারা হত্যা করেছিল, তাদের মধ্যেও কোনো অনুশোচনা নেই; তারা এখনো আন্দোলনকারীদের চরমপন্থী বলে আখ্যা দিচ্ছে। নূরুল কবীর জোর দিয়ে বলেন, এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে বোঝাতে হবে যে তাদের ভুল ছিল। কেবল তখনই সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে নতুন সমাজ গঠন সম্ভব হবে।




























