হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক পুনর্গঠনে ইরানের নতুন কৌশল
- আপডেট সময় : ০৮:৫৬:০১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

১ অক্টোবর ইরান দক্ষিণ লেবাননে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল পাঠায়। এই দলের নেতৃত্বে ছিলেন ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেইন ইয়েকতা এবং কট্টরপন্থী ধর্মীয় নেতা আলিরেজা পানাহিয়ান। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তাঁরা দুজনেই সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে একই ব্যাটালিয়নে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁদের এই সফর এমন এক সময়ে হয়েছে যখন হিজবুল্লাহ সামরিকভাবে দুর্বল, রাজনৈতিক চাপের মুখে এবং ইরানের দিকনির্দেশনার ওপর অধিক নির্ভরশীল। যদিও প্রতিনিধিদলটি সরাসরি হিজবুল্লাহ পুনর্গঠনের দায়িত্ব পেয়েছে কি না তা নিশ্চিত নয়, তবে তাদের পরিচয় ও সফরের সময় ইঙ্গিত দেয় যে তেহরান কেবল অস্ত্রভান্ডার পূর্ণ করতে নয়, বরং হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক স্থিতিস্থাপকতা পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।
গত কয়েক দশকের যুদ্ধ হিজবুল্লাহর পুরোনো সামরিক কাঠামোর দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট করেছে। জ্যেষ্ঠ কমান্ডারদের মৃত্যু, অবকাঠামো ধ্বংস এবং অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় সংগঠনটি এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে। এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ এখন বড় বাহিনীর পরিবর্তে ছোট ও বিকেন্দ্রীকৃত ইউনিট, ড্রোন, গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র এবং গেরিলা কৌশলের ওপর নির্ভর করছে। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত তাদের সংঘাতের মাত্র ১১ শতাংশ ছিল সরাসরি সংঘর্ষ, যা ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের স্থল অভিযানের সময় ছিল ৩৪ শতাংশ। একই সঙ্গে আত্মঘাতী ড্রোনের ব্যবহার ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ফাইবার-অপটিক ফার্স্ট-পারসন-ভিউ (এফপিভি) ড্রোন, যা ২০২৪ সালে অনুপস্থিত ছিল, তা এখন মোট হামলার ২১ শতাংশে ব্যবহৃত হয়েছে।
ইরান এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে হিজবুল্লাহকে এমনভাবে গড়ে তুলতে চাইছে, যা ইসরায়েলের মতো শক্তিশালী শত্রুর বিরুদ্ধে টিকে থাকতে সক্ষম। রয়টার্সের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের যুদ্ধের পর আইআরজিসি প্রায় ১০০ কর্মকর্তাকে লেবাননে পাঠিয়েছিল, যারা যোদ্ধাদের পুনঃপ্রশিক্ষণ, নতুন করে অস্ত্রসজ্জা এবং সংগঠনটির পুনর্বিন্যাস তদারক করেছেন। তেহরানের লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহকে একটি টেকসই প্রতিরোধক্ষমতা সম্পন্ন সংগঠনে পরিণত করা, যাতে ইরানের স্বার্থ রক্ষায় তারা ভবিষ্যতে বড় ধরনের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা বজায় রাখতে পারে।
হিজবুল্লাহর পুনর্গঠন কেবল সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও সামাজিকও। ২৭ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির নেতা নাঈম কাসেম ঘোষণা করেন, যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত লেবানিজদের আবাসন প্রকল্পে সংগঠনটি সহায়তা করবে। সংঘাতের সময় ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন এবং রয়টার্স জানিয়েছে, তিন লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ এখনো গৃহহীন। ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ ও সামাজিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে হিজবুল্লাহ তাদের রাজনৈতিক বৈধতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। তবে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে যে, পুনর্গঠনপ্রক্রিয়া হিজবুল্লাহকে পুনরায় শক্তিশালী করে তুলতে পারে, যা লেবাননের রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলবে।
সিরিয়া সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র চোরাচালান ও হিজবুল্লাহর তৎপরতা নিয়ে সিরীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের মতপার্থক্য দেখা দিলেও, ইরান তার প্রক্সি বাহিনীকে অপ্রাসঙ্গিক হতে দিতে চায় না। তেহরান হিজবুল্লাহর সামরিক আধিপত্যের চেয়ে তার সাংগঠনিক সংহতি, সামাজিক ভিত্তি এবং টিকে থাকার সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ইয়েকতার মতো আদর্শিক ও সদস্য সংগ্রহে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, ইরান অস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি সংগঠনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও আদর্শিক সংহতিকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। এই নতুন মডেলে হিজবুল্লাহ আগের চেয়ে কম দৃশ্যমান, অধিকতর বিকেন্দ্রীকৃত এবং আধিপত্য বিস্তারের পরিবর্তে টিকে থাকার উপযোগী একটি সংগঠনে পরিণত হচ্ছে।




























