মেট্রোরেলে হাফপ্যান্টে বাধা, ফের পোশাক বিতর্কের ঝড়
- আপডেট সময় : ০৭:৪৪:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬ ১২ বার পড়া হয়েছে

সম্প্রতি মেট্রোরেলে হাফপ্যান্ট পরা এক অ্যাথলেটকে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে পোশাকের শালীনতা ও নাগরিকের স্বাধীনতার বিতর্ক নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে। গত ২৭শে সেপ্টেম্বর এই ঘটনা ঘটে, যেখানে একজন পুলিশ কর্মকর্তা হাফপ্যান্ট পরা ওই অ্যাথলেটকে প্রায় চল্লিশ মিনিট প্রবেশমুখে আটকে রাখেন এবং হেনস্তা করেন। যদিও মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ পরে এই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং জানিয়েছে যে তাদের মেট্রোতে প্রবেশে পোশাকের কোনো নির্দিষ্ট বিধিমালা নেই, তবুও এই ঘটনা সমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, হাফপ্যান্ট কি আসলেই অশালীন পোশাক, এবং একজন অতি উৎসাহী কর্মকর্তা কি নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন?
পোশাক নিয়ে এমন বিতর্ক অবশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়। বহু বছর আগে একটি পাঁচ তারকা হোটেলে লুঙ্গি পরা একজন কবিকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছিল, অথচ শর্টপ্যান্ট পরা একজন বিদেশি অনায়াসে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন। পরে ওই কবি লুঙ্গির নিচে পরা শর্টপ্যান্ট দেখিয়ে প্রবেশ করেন। ঢাকা ক্লাবেও পোশাক বিধিমালা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক চলমান। ব্রিটিশদের তৈরি এই ক্লাবে একসময় 'বাঙালি আর কুকুরের প্রবেশ নিষেধ' লেখা থাকত। ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ এলেও ক্লাব কর্তৃপক্ষ পোশাক নীতিমালায় অনড় ছিল। যদিও অনেক বিতর্কের পর সম্প্রতি তারা কিছু পরিবর্তন এনেছে। ২০০৯ সালের অক্টোবরে লুঙ্গি পরার কারণে লেখক ফরহাদ মজহারকে ঢাকা ক্লাবে প্রবেশ করতে না দেওয়ার ঘটনাটিও সে সময় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল।
২০২২ সালের ১৮ই মে নরসিংদী স্টেশনে ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনা পোশাক বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছিল। সেদিন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণী জিনস ও টপস পরে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করার সময় দুজন বোরকা পরা নারী ও দুজন পুরুষের হাতে গালিগালাজ ও মারধরের শিকার হন। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। নরসিংদী গোয়েন্দা পুলিশ প্রধান অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করেন এবং এ ঘটনায় মামলাও হয়। রাজধানী থেকে অসংখ্য মানুষ জিনস টপস পরে দলবেঁধে নরসিংদীতে গিয়ে এই পোশাকে অশালীন কিছু নেই বলে প্রতিবাদ জানায়।
পোশাকের এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণও প্রাসঙ্গিক। ১৯৯৩ সালে নটর ডেম কলেজে প্রথম দিনের ক্লাসে গার্ডিয়ান টেরেন্স পিনেরু শিক্ষার্থীদের পোশাক নিয়ে আলোচনা করেন। তখনো কলেজের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক নির্ধারিত না হলেও তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, জিনস কেটে পাঙ্কু ডিজাইনে ক্লাসে আসা যাবে না। সে সময় তিনি ‘আয়রন মেইডেন’ লেখা টি-শার্ট পরা এক শিক্ষার্থীকে এর অর্থ জানতে চান। শিক্ষার্থী অপারগতা প্রকাশ করলে স্যার তাকে জানান যে এর অর্থ ‘লৌহময়ী তরুণী’ এবং না জেনে এমন পোশাক পরা ঠিক নয়।
এই সকল ঘটনা একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে: প্রতিটি নাগরিকের চলাফেরা ও পোশাকের স্বাধীনতা তার মৌলিক অধিকার। কে হাফপ্যান্ট পরছে, কে জিনস টপস পরছে, বা কে বোরকা পরে চলাফেরা করছে—এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। সভ্য দুনিয়ার দেশগুলোতে এমনটাই নজির। তাহলে আমাদের অবস্থান কোথায়? শর্টস পরে মেট্রোতে উঠতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে এক পক্ষ কর্মসূচি পালন করেছে, এর বিপরীতে আরেক পক্ষ শর্টসকে অশালীন আখ্যা দিয়ে ফুলপ্যান্ট ও বোরকা বিতরণ শুরু করেছে। এমন চাপিয়ে দেওয়া কোনো কিছুই সমাজে সঠিক বার্তা দেয় না, বরং ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়। ভিন্ন মত ও ভিন্ন সংস্কৃতির বিকাশ ও লালনই একটি সত্যিকার বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের ইতিবাচক সূচক।
শালীন ও অশালীন পোশাকের পার্থক্য কেবল ‘অ’ অক্ষরটিতেই সীমাবদ্ধ। আসল তফাৎটা চিন্তা-চেতনায় এবং মন-মানসিকতায়। মেট্রোরেলে হাফপ্যান্ট পরা যে ব্যক্তি বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন একজন অ্যাথলেট, যিনি সম্ভবত অনুশীলন শেষে ফিরছিলেন। এর মধ্যে অশালীন কিছু ছিল না। এমনকি তিনি অ্যাথলেট না হলেও তাতে দোষের কী? যদি মন ও মস্তিষ্কে অসুস্থ বা বিকৃত মানসিকতা না থাকে এবং দেখার দৃষ্টিভঙ্গি সুন্দর হয়, তাহলে এই বিষয় নিয়ে কোনো পক্ষেরই বাড়াবাড়ি করা সমীচীন নয়।





























