ঢাকা ০৬:৪৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সিগারেটের নতুন খুচরা মূল্য নির্ধারণ: ৬৫ থেকে ২১০ টাকা ভারতের উত্তর প্রদেশে বন্যা ও ভূমিধসে নিহত ৫৬ হাফপ্যান্ট পরায় অ্যাথলেট প্রশিক্ষককে মেট্রোস্টেশনে হেনস্তা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা অগ্রহণযোগ্য, মন্তব্য রাশিয়ার ভালো কিংবা মন্দ, সরকারের পাঁচ বছরের ‘চুক্তি’ মেনেই ধৈর্য ধরার পরামর্শ প্রতিবাদ ও ‘আগের ১৪ বছর’ বিতর্ক: একটি সামাজিক বিশ্লেষণ রাড্ডা ক্লিনিকে হামলায় ওসির অবহেলার প্রমাণ, ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শাহজালাল বিমানবন্দরে ২৮ লাখ টাকার সিরিঞ্জসহ নারী যাত্রী আটক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯ শিক্ষার্থী পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করলেন আইনমন্ত্রী

কাফকার শেষ ইচ্ছা ও ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১১:৫৭:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



ফ্রানৎস কাফকা তার মৃত্যুর আগে বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার সমস্ত অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, ডায়েরি, চিঠিপত্র এবং অসমাপ্ত উপন্যাস পুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু ব্রড সেই নির্দেশ মানেননি বলেই ‘দ্য ট্রায়াল’, ‘দ্য ক্যাসল’ এবং ‘আমেরিকা’-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টি পৃথিবীর সামনে এসেছে। ফেলিসে বাউয়ারকে লেখা তার প্রেমপত্রগুলো প্রকাশের ক্ষেত্রেও একই নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে—লেখকের মৃত্যুর পর তার ব্যক্তিগত চিঠি কি পাঠকের সম্পত্তি হতে পারে?

কাফকার এই শেষ ইচ্ছার বিষয়টি বেশ জটিল, কারণ তার ‘উইল’-এর ভাষার মধ্যেই ছিল এক গভীর দ্বন্দ্ব। তিনি একদিকে নিজের কাজ ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে তার অস্তিত্বের একমাত্র সত্য হিসেবে সাহিত্যকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন। ১৯২৪ সালে মৃত্যুর পর তার ডেস্কে একটি অনির্দিষ্ট তারিখের কাগজে প্রথম নির্দেশটি পাওয়া যায়, যেখানে তিনি সব পাণ্ডুলিপি ‘না পড়েই’ পুড়িয়ে ফেলার কথা বলেছিলেন। এর আগে ১৯২২ সালের দিকে পেন্সিলে লেখা আরও একটি উইল পাওয়া যায়, যেখানে কয়েকটি বিশেষ লেখা—যেমন ‘দ্য জাজমেন্ট’, ‘দ্য মেটামরফোসিস’ এবং ‘আ হাঙ্গার আর্টিস্ট’—ধ্বংসের তালিকা থেকে বাদ ছিল। মজার বিষয় হলো, এর মধ্যে কিছু লেখা কাফকা নিজেই জীবদ্দশায় প্রকাশ করেছিলেন।

ম্যাক্স ব্রডকে লেখা ১৯২২ সালের এক চিঠিতে কাফকা জানিয়েছিলেন, নিজের লেখার নিন্দা করার মধ্যে সত্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল এক ধরনের কৌশলও। তিনি হয়তো সত্যিই মনে করতেন তার লেখা মানসম্মত নয়, কিন্তু একই সঙ্গে এমনভাবে নিজের কাজের সমালোচনা করতেন যাতে প্রকাশক সেটি ফিরিয়ে দিতে সাহস না পান। তার শেষ গল্প ‘জোসেফিন দ্য সিঙ্গার’-এর মূল চরিত্রের মতো কাফকার নিজের মধ্যেও একই প্রবণতা ছিল—‘আমাকে ভুলে যাও’ বলার মধ্যেই লুকিয়ে থাকত ‘আমাকে মনে রেখো’-এর আকাঙ্ক্ষা।

কাফকার জীবনের কেন্দ্রে ছিল সংসার ও সাহিত্য নিয়ে এক চিরস্থায়ী দ্বন্দ্ব। কাফকা মনে করতেন, লেখালেখি তার জীবনের কেন্দ্র। ১৯১৩ সালে তিনি ফেলিসেকে লিখেছিলেন, তিনি সাহিত্যে ‘আগ্রহী’ নন; বরং তিনি নিজেই সাহিত্য—“আমি সাহিত্য দিয়ে তৈরি, আমি আর কিছু নই।” তার কাছে লেখা কোনো পেশা বা শখ ছিল না। এটি ছিল তার অস্তিত্বের অংশ। তিনি এমনকি বলেছিলেন, তার স্ত্রীকে যেন এক সন্ন্যাসীর মতো জীবন কাটাতে হবে এমন এক মানুষের পাশে, যে অদৃশ্য সাহিত্যের শিকলে বাঁধা। ফেলিসে বাউয়ারের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল ১৯১২ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত। তিনি ফেলিসেকে দুবার বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসেন। কাফকার কাছে লেখালেখি ছিল অস্তিত্বের অংশ, তাই বিবাহ তার কাছে গভীরতম সত্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হতো। তিনি মনে করতেন, সংসার বা সামাজিক জীবন তাকে তার লেখার জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।

ফেলিসেকে লেখা চিঠিগুলোতে তিনি বাস্তব জীবনকে ধরে রাখতে চাইতেন। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে ধরে রাখার চেষ্টাই ক্রমে সাহিত্যে রূপ নিত। ১৯১৬ সালে মারিয়েনবাদে ফেলিসের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর পর তাদের সম্পর্কে সাময়িক স্থিরতা এলেও, তা স্থায়ী হয়নি। তার প্রেমপত্রগুলো ছিল এক অদ্ভুত দ্বৈত জীবনের দলিল, যেখানে তিনি প্রিয়জনকে কাছে টানতেন আবার দূরে ঠেলে দিতেন।

কাফকার কাছে সাহিত্য ছিল একদিকে বাঁচার অবলম্বন, আবার অন্যদিকে শয়তানের কাছে দেওয়া পুরস্কারের মতো অভিশাপ। ১৯২২ সালে ম্যাক্স ব্রডকে তিনি লিখেছিলেন, লেখা তাকে বাঁচিয়ে রাখে কিন্তু পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নও করে। তবুও শিল্পের মাধ্যমে পৃথিবীকে শুদ্ধ করার প্রচেষ্টাই ছিল তার জীবনের মূল ভিত্তি। কাফকার ‘উইল’কে তাই কেবল একটি শেষ নির্দেশ হিসেবে না দেখে তার অন্তহীন দ্বন্দ্বের প্রকাশ হিসেবে দেখা উচিত। তিনি সাহিত্য ছাড়া আর কিছু ছিলেন না, তাই সাহিত্য ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া ছিল নিজেরই একটি অংশকে ধ্বংস করার মতো। মৃত্যুর এক শতাব্দী পরও কাফকার লেখা আমাদের কাছে নিজেকে বোঝার এক অনিবার্য আয়না হয়ে আছে। দৈনিক এদিন অনলাইন ধারাবাহিকভাবে ‘লেটার্স টু ফেলিস বাই ফ্রান্ৎস কাফকা’ বই থেকে তার চিঠিগুলো প্রকাশ করবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

নিউজটি শেয়ার করুন

কাফকার শেষ ইচ্ছা ও ব্যক্তিগত চিঠিপত্রের অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব

আপডেট সময় : ১১:৫৭:০২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফ্রানৎস কাফকা তার মৃত্যুর আগে বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে নির্দেশ দিয়েছিলেন তার সমস্ত অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি, ডায়েরি, চিঠিপত্র এবং অসমাপ্ত উপন্যাস পুড়িয়ে ফেলতে। কিন্তু ব্রড সেই নির্দেশ মানেননি বলেই ‘দ্য ট্রায়াল’, ‘দ্য ক্যাসল’ এবং ‘আমেরিকা’-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টি পৃথিবীর সামনে এসেছে। ফেলিসে বাউয়ারকে লেখা তার প্রেমপত্রগুলো প্রকাশের ক্ষেত্রেও একই নৈতিক প্রশ্ন সামনে আসে—লেখকের মৃত্যুর পর তার ব্যক্তিগত চিঠি কি পাঠকের সম্পত্তি হতে পারে?

কাফকার এই শেষ ইচ্ছার বিষয়টি বেশ জটিল, কারণ তার ‘উইল’-এর ভাষার মধ্যেই ছিল এক গভীর দ্বন্দ্ব। তিনি একদিকে নিজের কাজ ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, অন্যদিকে তার অস্তিত্বের একমাত্র সত্য হিসেবে সাহিত্যকেই আঁকড়ে ধরেছিলেন। ১৯২৪ সালে মৃত্যুর পর তার ডেস্কে একটি অনির্দিষ্ট তারিখের কাগজে প্রথম নির্দেশটি পাওয়া যায়, যেখানে তিনি সব পাণ্ডুলিপি ‘না পড়েই’ পুড়িয়ে ফেলার কথা বলেছিলেন। এর আগে ১৯২২ সালের দিকে পেন্সিলে লেখা আরও একটি উইল পাওয়া যায়, যেখানে কয়েকটি বিশেষ লেখা—যেমন ‘দ্য জাজমেন্ট’, ‘দ্য মেটামরফোসিস’ এবং ‘আ হাঙ্গার আর্টিস্ট’—ধ্বংসের তালিকা থেকে বাদ ছিল। মজার বিষয় হলো, এর মধ্যে কিছু লেখা কাফকা নিজেই জীবদ্দশায় প্রকাশ করেছিলেন।

ম্যাক্স ব্রডকে লেখা ১৯২২ সালের এক চিঠিতে কাফকা জানিয়েছিলেন, নিজের লেখার নিন্দা করার মধ্যে সত্য যেমন ছিল, তেমনি ছিল এক ধরনের কৌশলও। তিনি হয়তো সত্যিই মনে করতেন তার লেখা মানসম্মত নয়, কিন্তু একই সঙ্গে এমনভাবে নিজের কাজের সমালোচনা করতেন যাতে প্রকাশক সেটি ফিরিয়ে দিতে সাহস না পান। তার শেষ গল্প ‘জোসেফিন দ্য সিঙ্গার’-এর মূল চরিত্রের মতো কাফকার নিজের মধ্যেও একই প্রবণতা ছিল—‘আমাকে ভুলে যাও’ বলার মধ্যেই লুকিয়ে থাকত ‘আমাকে মনে রেখো’-এর আকাঙ্ক্ষা।

কাফকার জীবনের কেন্দ্রে ছিল সংসার ও সাহিত্য নিয়ে এক চিরস্থায়ী দ্বন্দ্ব। কাফকা মনে করতেন, লেখালেখি তার জীবনের কেন্দ্র। ১৯১৩ সালে তিনি ফেলিসেকে লিখেছিলেন, তিনি সাহিত্যে ‘আগ্রহী’ নন; বরং তিনি নিজেই সাহিত্য—“আমি সাহিত্য দিয়ে তৈরি, আমি আর কিছু নই।” তার কাছে লেখা কোনো পেশা বা শখ ছিল না। এটি ছিল তার অস্তিত্বের অংশ। তিনি এমনকি বলেছিলেন, তার স্ত্রীকে যেন এক সন্ন্যাসীর মতো জীবন কাটাতে হবে এমন এক মানুষের পাশে, যে অদৃশ্য সাহিত্যের শিকলে বাঁধা। ফেলিসে বাউয়ারের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল ১৯১২ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত। তিনি ফেলিসেকে দুবার বিয়ে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসেন। কাফকার কাছে লেখালেখি ছিল অস্তিত্বের অংশ, তাই বিবাহ তার কাছে গভীরতম সত্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হতো। তিনি মনে করতেন, সংসার বা সামাজিক জীবন তাকে তার লেখার জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে।

ফেলিসেকে লেখা চিঠিগুলোতে তিনি বাস্তব জীবনকে ধরে রাখতে চাইতেন। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে ধরে রাখার চেষ্টাই ক্রমে সাহিত্যে রূপ নিত। ১৯১৬ সালে মারিয়েনবাদে ফেলিসের সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর পর তাদের সম্পর্কে সাময়িক স্থিরতা এলেও, তা স্থায়ী হয়নি। তার প্রেমপত্রগুলো ছিল এক অদ্ভুত দ্বৈত জীবনের দলিল, যেখানে তিনি প্রিয়জনকে কাছে টানতেন আবার দূরে ঠেলে দিতেন।

কাফকার কাছে সাহিত্য ছিল একদিকে বাঁচার অবলম্বন, আবার অন্যদিকে শয়তানের কাছে দেওয়া পুরস্কারের মতো অভিশাপ। ১৯২২ সালে ম্যাক্স ব্রডকে তিনি লিখেছিলেন, লেখা তাকে বাঁচিয়ে রাখে কিন্তু পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নও করে। তবুও শিল্পের মাধ্যমে পৃথিবীকে শুদ্ধ করার প্রচেষ্টাই ছিল তার জীবনের মূল ভিত্তি। কাফকার ‘উইল’কে তাই কেবল একটি শেষ নির্দেশ হিসেবে না দেখে তার অন্তহীন দ্বন্দ্বের প্রকাশ হিসেবে দেখা উচিত। তিনি সাহিত্য ছাড়া আর কিছু ছিলেন না, তাই সাহিত্য ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া ছিল নিজেরই একটি অংশকে ধ্বংস করার মতো। মৃত্যুর এক শতাব্দী পরও কাফকার লেখা আমাদের কাছে নিজেকে বোঝার এক অনিবার্য আয়না হয়ে আছে। দৈনিক এদিন অনলাইন ধারাবাহিকভাবে ‘লেটার্স টু ফেলিস বাই ফ্রান্ৎস কাফকা’ বই থেকে তার চিঠিগুলো প্রকাশ করবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin