ঢাকা ০৪:২২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
চট্টগ্রামে হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন সয়াবিন তেলের বাজারে কৃত্রিম সংকট, দাম বাড়ানোর পাঁয়তারার অভিযোগ বাগেরহাটে শিশুর গলাকাটা লাশ উদ্ধার, অভিযুক্তের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট অর্থকষ্টে দেশ ছাড়তে চেয়েছিলেন অঞ্জলি আনন্দ, যেভাবে ফিরলেন বড় পর্দায় জায়েদের সহায়তার টাকা কেন নিলেন না অভিনেতা রিফাত চৌধুরী হরমুজ প্রণালিতে ইরান বাড়াবাড়ি করছে: সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা মোহাম্মদপুরে পুলিশ ফাঁড়ির সামনেই তাণ্ডব চালিয়ে জমি দখল কোটালীপাড়ায় উপজেলা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এমপি জিলানীর উন্নয়ন আলোচনা রাজনীতিতে যতিচিহ্ন নেই, কী ভবিষ্যৎ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের? টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে বাস চাপায় দুই কিশোর নিহত

ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইয়ে দাওয়াহ ও রাজনীতি পৃথক করার নতুন প্রস্তাব

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১১:৫৬:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের সদ্য প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইটি নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এবং এ বিষয়ে দলটির ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। বইটির চতুর্থ অধ্যায়ে এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে, যেখানে দলের অভ্যন্তরে সংস্কারের চেষ্টা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মতামতও যুক্ত রয়েছে। তবে ১৯৭১ সালের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গটির বাইরেও বইটির শেষ দিকের অধ্যায়গুলোতে ইসলামি আন্দোলনের উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক দলের সীমাবদ্ধতা এবং দাওয়াহ ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে যে মৌলিক প্রশ্ন ও কৌশলগত কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে, তা এখনো যথেষ্ট আলোচিত হয়নি। এই বিষয়ে বিশদ আলোকপাত করেছেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের কনিষ্ঠ পুত্র ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান সিদ্দিক।

বইটির প্রথম তিন অধ্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর দর্শন, সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক ভূমিকার একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৫৭ সালে পাঞ্জাবের মাছিগোঠে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে জামায়াতের সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে দলটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট এতে স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জামায়াতের বিভিন্ন আইনি ও রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার বিবরণ রয়েছে। এর মধ্যে অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের পক্ষে আইনি লড়াই এবং দলটির নিবন্ধন রক্ষার সাংবিধানিক মামলার প্রসঙ্গগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তবে বইটির পঞ্চম অধ্যায় থেকে শুরু হওয়া অংশটিকে সবচেয়ে চিন্তার খোরাক জোগানো অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে: ইসলামি আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কি কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা বা তাতে যোগদান করা অপরিহার্য? বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক দল যেখানে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকেই প্রধান লক্ষ্য মনে করে, সেখানে ব্যারিস্টার রাজ্জাক এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত পরিসরে দেখার প্রস্তাব করেছেন। তাঁর মতে, ইসলামি জাগরণ কেবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দাওয়াহকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, দাঈদের প্রশিক্ষণ, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, গণমাধ্যমের ব্যবহার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হতে পারে। মুহাম্মদ আসাদ, হাসান আল-বান্না, ইউসুফ আল-কারযাভী এবং হাশিম কামালির মতো ইসলামি চিন্তাবিদদের মতামত পর্যালোচনা করে তিনি দেখিয়েছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিজেই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং সমাজে আল্লাহর বিধান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি সম্ভাব্য মাধ্যম মাত্র। মাধ্যমকে উদ্দেশ্যের সমতুল্য মনে করলে আন্দোলনের পরিধি সংকুচিত হয়ে পড়ে।

এই আলোচনা থেকে প্রশ্ন ওঠে, একজন মুসলমানকে কি তাঁর ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের জন্য আবশ্যিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে হবে? ব্যারিস্টার রাজ্জাক এ ক্ষেত্রে একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উত্তর দিয়েছেন। তাঁর মতে, সমাজের ইসলামীকরণের পথ অনেক। কোনো বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, গবেষক বা দাঈ রাজনৈতিক দলে যোগ না দিয়েও নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে সমাজে ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পারেন।

রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা ও সীমাবদ্ধতা—উভয় দিকই বইটিতে উঠে এসেছে। রাজনীতি সামাজিক পরিবর্তনের একটি কার্যকর মাধ্যম হলেও এর কিছু ঝুঁকি রয়েছে। যেমন রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য ইসলামি স্লোগানের ব্যবহার এবং কোনো দলের নির্বাচনী ব্যর্থতাকে ইসলামের প্রত্যাখ্যান হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা। এই বাস্তবতায় ব্যারিস্টার রাজ্জাক প্রচলিত ওপর থেকে নিচে (টপ ডাউন) পরিবর্তনের কৌশলের পাশাপাশি নিচ থেকে ওপরে (বটম আপ) সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া গড়ে তোলার প্রস্তাব করেছেন। তিনি মনে করেন, রাজনীতির পাশাপাশি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, থিঙ্কট্যাংক, দাওয়াহ ও মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম এবং পেশাজীবী সংগঠনে মেধা ও সম্পদ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তিনি সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভীর বক্তব্য উল্লেখ করে দেখিয়েছেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ না দিয়েও সমাজে ইসলামি ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালানো সম্ভব।

বইটির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো দাওয়াহ ও দলীয় রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পৃথক রাখা। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের মতে, দাওয়াহ ও রাজনীতি একই সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনে থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনের ডামাডোলে দাওয়াহ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম উপেক্ষিত হয়। তিনি মরক্কোর অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, সেখানে ‘আল-হারাকা আল-তাওহিদ ওয়াল-ইসলাহ’ (দাওয়াহ আন্দোলন) এবং ‘হিজবুল আদালত ওয়া-তানমিয়া’ (রাজনৈতিক দল) সাংগঠনিকভাবে পৃথক। এই মডেলটি মরক্কোর ইসলামি আন্দোলনের সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে এবং তুরস্কের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এমনকি পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক খুরশীদ আহমদও দাওয়াহ ও রাজনীতি পৃথক করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যদিও তা সেখানে গৃহীত হয়নি। এই পৃথকীকরণের পেছনে মূল উপলব্ধি হলো, রাজনৈতিক দলের সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে দাওয়াহকে যুক্ত করলে দীর্ঘমেয়াদি ধর্মীয় ও সামাজিক কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দলের ব্যর্থতার দায় বৃহত্তর আন্দোলনের ওপর পড়তে পারে।

ইমরান সিদ্দিক উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর পিতার এই বইয়ের সঙ্গে সবার একমত হওয়া আবশ্যক নয় এবং লেখক নিজেও তা প্রত্যাশা করেননি। বইটির উদ্দেশ্য কাউকে সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট করা নয়, বরং এটি একটি সৎ ঐতিহাসিক বিবরণ, জামায়াতের সীমাবদ্ধতার মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প কৌশলের প্রয়াস। বাংলাদেশের ইসলামি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অর্থবহ আলোচনা করতে হলে ১৯৭১ সালের বহুল আলোচিত প্রশ্নের পাশাপাশি এই অনালোচিত কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রস্তাবগুলোকেও জনপরিসরে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সেখানে তিনি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: ইসলামি আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইসলামি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা বা তাতে যোগদান করা কি অপরিহার্য?.ব্যারিস্টার রাজ্জাকের স্মৃতিকথা: ’৭১ ইস্যুতে ক্ষমা চাওয়া প্রশ্নে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব.বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক দল ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠ

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বইয়ে দাওয়াহ ও রাজনীতি পৃথক করার নতুন প্রস্তাব

আপডেট সময় : ১১:৫৬:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের সদ্য প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইটি নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার একটি বড় অংশ স্বাভাবিকভাবেই ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা এবং এ বিষয়ে দলটির ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। বইটির চতুর্থ অধ্যায়ে এই বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে, যেখানে দলের অভ্যন্তরে সংস্কারের চেষ্টা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের মতামতও যুক্ত রয়েছে। তবে ১৯৭১ সালের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গটির বাইরেও বইটির শেষ দিকের অধ্যায়গুলোতে ইসলামি আন্দোলনের উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক দলের সীমাবদ্ধতা এবং দাওয়াহ ও রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে যে মৌলিক প্রশ্ন ও কৌশলগত কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে, তা এখনো যথেষ্ট আলোচিত হয়নি। এই বিষয়ে বিশদ আলোকপাত করেছেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের কনিষ্ঠ পুত্র ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ইমরান সিদ্দিক।

বইটির প্রথম তিন অধ্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর দর্শন, সাংগঠনিক কাঠামো এবং রাজনৈতিক ভূমিকার একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৫৭ সালে পাঞ্জাবের মাছিগোঠে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে জামায়াতের সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে দলটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকট এতে স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জামায়াতের বিভিন্ন আইনি ও রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার বিবরণ রয়েছে। এর মধ্যে অধ্যাপক গোলাম আযমের নাগরিকত্ব মামলা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াত নেতাদের পক্ষে আইনি লড়াই এবং দলটির নিবন্ধন রক্ষার সাংবিধানিক মামলার প্রসঙ্গগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তবে বইটির পঞ্চম অধ্যায় থেকে শুরু হওয়া অংশটিকে সবচেয়ে চিন্তার খোরাক জোগানো অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে: ইসলামি আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী এবং এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য কি কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা বা তাতে যোগদান করা অপরিহার্য? বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক দল যেখানে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকেই প্রধান লক্ষ্য মনে করে, সেখানে ব্যারিস্টার রাজ্জাক এই ধারণাকে আরও বিস্তৃত পরিসরে দেখার প্রস্তাব করেছেন। তাঁর মতে, ইসলামি জাগরণ কেবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দাওয়াহকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, দাঈদের প্রশিক্ষণ, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, গণমাধ্যমের ব্যবহার এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হতে পারে। মুহাম্মদ আসাদ, হাসান আল-বান্না, ইউসুফ আল-কারযাভী এবং হাশিম কামালির মতো ইসলামি চিন্তাবিদদের মতামত পর্যালোচনা করে তিনি দেখিয়েছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নিজেই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়, বরং সমাজে আল্লাহর বিধান ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি সম্ভাব্য মাধ্যম মাত্র। মাধ্যমকে উদ্দেশ্যের সমতুল্য মনে করলে আন্দোলনের পরিধি সংকুচিত হয়ে পড়ে।

এই আলোচনা থেকে প্রশ্ন ওঠে, একজন মুসলমানকে কি তাঁর ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের জন্য আবশ্যিকভাবে কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দিতে হবে? ব্যারিস্টার রাজ্জাক এ ক্ষেত্রে একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উত্তর দিয়েছেন। তাঁর মতে, সমাজের ইসলামীকরণের পথ অনেক। কোনো বিচারক, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, গবেষক বা দাঈ রাজনৈতিক দলে যোগ না দিয়েও নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে সমাজে ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে পারেন।

রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা ও সীমাবদ্ধতা—উভয় দিকই বইটিতে উঠে এসেছে। রাজনীতি সামাজিক পরিবর্তনের একটি কার্যকর মাধ্যম হলেও এর কিছু ঝুঁকি রয়েছে। যেমন রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য ইসলামি স্লোগানের ব্যবহার এবং কোনো দলের নির্বাচনী ব্যর্থতাকে ইসলামের প্রত্যাখ্যান হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা। এই বাস্তবতায় ব্যারিস্টার রাজ্জাক প্রচলিত ওপর থেকে নিচে (টপ ডাউন) পরিবর্তনের কৌশলের পাশাপাশি নিচ থেকে ওপরে (বটম আপ) সমাজ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া গড়ে তোলার প্রস্তাব করেছেন। তিনি মনে করেন, রাজনীতির পাশাপাশি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, থিঙ্কট্যাংক, দাওয়াহ ও মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম এবং পেশাজীবী সংগঠনে মেধা ও সম্পদ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তিনি সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভীর বক্তব্য উল্লেখ করে দেখিয়েছেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ না দিয়েও সমাজে ইসলামি ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালানো সম্ভব।

বইটির আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো দাওয়াহ ও দলীয় রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পৃথক রাখা। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের মতে, দাওয়াহ ও রাজনীতি একই সাংগঠনিক কাঠামোর অধীনে থাকলে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচনের ডামাডোলে দাওয়াহ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম উপেক্ষিত হয়। তিনি মরক্কোর অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে দেখিয়েছেন, সেখানে ‘আল-হারাকা আল-তাওহিদ ওয়াল-ইসলাহ’ (দাওয়াহ আন্দোলন) এবং ‘হিজবুল আদালত ওয়া-তানমিয়া’ (রাজনৈতিক দল) সাংগঠনিকভাবে পৃথক। এই মডেলটি মরক্কোর ইসলামি আন্দোলনের সাফল্যে ভূমিকা রেখেছে এবং তুরস্কের জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। এমনকি পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক খুরশীদ আহমদও দাওয়াহ ও রাজনীতি পৃথক করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যদিও তা সেখানে গৃহীত হয়নি। এই পৃথকীকরণের পেছনে মূল উপলব্ধি হলো, রাজনৈতিক দলের সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে দাওয়াহকে যুক্ত করলে দীর্ঘমেয়াদি ধর্মীয় ও সামাজিক কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং দলের ব্যর্থতার দায় বৃহত্তর আন্দোলনের ওপর পড়তে পারে।

ইমরান সিদ্দিক উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর পিতার এই বইয়ের সঙ্গে সবার একমত হওয়া আবশ্যক নয় এবং লেখক নিজেও তা প্রত্যাশা করেননি। বইটির উদ্দেশ্য কাউকে সন্তুষ্ট বা অসন্তুষ্ট করা নয়, বরং এটি একটি সৎ ঐতিহাসিক বিবরণ, জামায়াতের সীমাবদ্ধতার মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের জন্য বিকল্প কৌশলের প্রয়াস। বাংলাদেশের ইসলামি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়ে অর্থবহ আলোচনা করতে হলে ১৯৭১ সালের বহুল আলোচিত প্রশ্নের পাশাপাশি এই অনালোচিত কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রস্তাবগুলোকেও জনপরিসরে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সেখানে তিনি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: ইসলামি আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইসলামি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করা বা তাতে যোগদান করা কি অপরিহার্য?.ব্যারিস্টার রাজ্জাকের স্মৃতিকথা: ’৭১ ইস্যুতে ক্ষমা চাওয়া প্রশ্নে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব.বিভিন্ন ইসলামি রাজনৈতিক দল ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠ

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo