জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সামনে এক বিরল কূটনৈতিক সুযোগ
- আপডেট সময় : ০২:১৩:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নিয়মিত আন্তর্জাতিক আয়োজন নয়, বরং এটি একটি বিরল কূটনৈতিক সুযোগ। ৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অধিবেশনের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ ২২ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে সাধারণ বিতর্ক চলবে ২২-২৬ ও ২৮ সেপ্টেম্বর। এবারের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘আস্থা পুনর্গঠন, পরিবর্তন সামলানো এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ গড়ে তোলা’।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবারের সাধারণ পরিষদের সভাপতির আসনে আসীন হয়েছেন, যা বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। গত ২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থীকে (৯১ ভোট) পরাজিত করে এই পদে নির্বাচিত হন। যদিও সভাপতি হিসেবে তাঁকে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের নিরপেক্ষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে হয় এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা চালাতে হয়, তবুও এই পদটি বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অস্বাভাবিকভাবে দৃশ্যমান করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দৃশ্যমানতাকে যদি ঢাকা পরিণত, সংযত ও পরিকল্পিত কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, তবে এবারের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য একটি ‘কূটনৈতিক জানালা’ হিসেবে কাজ করবে। মনে রাখা প্রয়োজন, ২০২৫ সালের ৮০তম অধিবেশন ছিল জাতিসংঘের ৮০ বছর পূর্তির অধিবেশন, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের দরকার বাজারনির্ভর দক্ষতা কূটনীতি—শুধু মানুষ পাঠানো নয়, দক্ষতা নিয়ে অংশীদারত্ব তৈরি করা। ভারত প্রশ্নে বাংলাদেশের কৌশল কী হতে পারে এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: সাময়িক উত্তেজনা বনাম দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটকে সবচেয়ে জোরালোভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার বহনকারী বাংলাদেশের উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে প্রত্যাবাসনের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির দায়িত্ব এবং মানবিক সহায়তার অনিশ্চয়তা নিয়ে দৃঢ় প্রশ্ন তোলা। প্রত্যাবাসন অবশ্যই স্বেচ্ছামূলক, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে এবং ‘পরিস্থিতি অনুকূল নয়’—এই অজুহাত যেন স্থায়ী রূপ না পায়।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বর্তমান সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের মধ্যে এই উত্তরণ ঘটার কথা থাকলেও সরকার প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে শুধু সাফল্যের কথা নয়, বরং ‘মসৃণ উত্তরণ’-এর দাবিটিও জোরালো হওয়া উচিত, যাতে শুল্কসুবিধা ও মেধাস্বত্বের মতো বিষয়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এছাড়া দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে বাণিজ্য-সম্পর্কের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরির পাশাপাশি অভিবাসন নিয়ে অভিবাসীর অধিকার, নিয়োগ ব্যয়, মজুরি চুরি ও দক্ষতার স্বীকৃতির মতো বিষয়গুলো তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে।
২০২৬ সালে দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, কারণ এখন একটি নির্বাচিত সরকার রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবার শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিবরণ নয়, বরং আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের বৈদেশিক নীতি ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনাও শুনতে চাইবে। পরিশেষে, এই সফরের সাফল্য কেবল ভাষণের ওপর নির্ভর করবে না, বরং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, বাণিজ্য অংশীদারত্ব, অভিবাসীদের অধিকার ও জলবায়ু অর্থায়নের মতো বিষয়ে কতটা বাস্তব ফল অর্জন করা সম্ভব হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার পরীক্ষা।





























