ভিডিও বিতর্ক থেকে রিমান্ড: যেভাবে পতনের মুখে এমপি গাজী নজরুল
- আপডেট সময় : ০৫:০০:৩৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন গত দুই মাসে চরম সংকটের মুখে পড়েছে। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই প্রবীণ রাজনীতিকের জীবনে একের পর এক বিতর্কিত ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলায় তিনি এখন পুলিশের চার দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।
গাজী নজরুলের এই সংকটের শুরু গত জুলাইয়ের শেষ দিকে, যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর একটি অন্তরঙ্গ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে জামায়াত নেতা-কর্মীরা এটিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করলেও পরে গাজী নজরুল নিজেই স্বীকার করেন যে ভিডিওর তরুণী তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন। তিনি জানান, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। তবে এই ঘটনায় নৈতিক স্খলনের অভিযোগ এনে গত ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে। বিষয়টি সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনকেও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ বহাল রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে রাজনৈতিকভাবে তাঁর পথ সংকুচিত হয়ে পড়ে। তাঁকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি এবং সরকারি প্রতিশ্রুতি-সম্পর্কিত কমিটি থেকেও তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়। সংবিধান অনুযায়ী দল থেকে বহিষ্কার করলেই সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয় না, এ বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এখনও কোনো সিদ্ধান্ত দেননি। দলের নেতারা তাঁকে পদত্যাগ করার পরামর্শ দিলেও তিনি দলে ফেরার চেষ্টা করছিলেন এবং এমনকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দিনও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর বেলা ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে কোনো এক সময় এই ঘটনা ঘটে। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে গাজী নজরুল নিজেই মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত বাসায় আসতে বলেন। মরিয়মের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ সেখানে গিয়ে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান এবং পরে পুলিশের উপস্থিতিতে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকা হয়। ঘর থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়েছে, যাতে বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে, যা এখন ফরেনসিক পরীক্ষার অপেক্ষায় আছে।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বাবা মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা করেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারে অভিযোগ করা হয়, বিয়ের পর থেকেই মরিয়মকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো, যা তিনি মুঠোফোনে পরিবারকে জানিয়েছিলেন। এই বিয়েতে ওবায়দুর রহমানের ভূমিকা থাকলেও পরে তাঁর সঙ্গেও বিরোধ তৈরি হয়। মামলা দায়েরের পর পুলিশ গাজী নজরুল ও তাঁর প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে এবং আদালত তাঁদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের পর সর্বশেষ নির্বাচনে জয়ী হওয়া এই প্রবীণ রাজনীতিকের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের এই দ্রুত পতন এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।




























