এক বছর পার হলেও অপূর্ণ চবি চাকসুর মূল প্রতিশ্রুতি
- আপডেট সময় : ০৮:০৭:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

দীর্ঘ ৩৫ বছর পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) সচল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। গত বছরের ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২৩ অক্টোবর শপথ নিয়েছিলেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। তবে আগামী ২৩ অক্টোবর বর্তমান কমিটির মেয়াদের এক বছর পূর্ণ হতে চললেও শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত মূল প্রতিশ্রুতিগুলোর বড় অংশই এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। নির্বাচনের আগে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ যে ৩৩ দফা ইশতেহার দিয়েছিল, তার বেশির ভাগই এখনো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতেই জয়ী হয়েছিল এই প্যানেলটি। কিন্তু এক বছর শেষে দেখা যাচ্ছে, তাদের দেওয়া ৩৩ দফার মধ্যে ১৮টি প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়িত হয়নি। পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে ১০টি এবং আংশিক হয়েছে ৫টি। বাস্তবায়িত হওয়া কাজগুলোর বেশির ভাগই তুলনামূলক ছোট পরিসরের বা সাধারণ কার্যক্রমনির্ভর হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মৌলিক সংকটের চিত্র বদলায়নি।
শুধু প্যানেলের ইশতেহারই নয়, চাকসুর সম্পাদক, সহসম্পাদক ও কার্যনির্বাহী সদস্যদের দেওয়া ব্যক্তিগত ২২২টি অঙ্গীকারের মধ্যেও ১০৭টি বাস্তবায়িত হয়নি। এর মধ্যে ৬০টি পুরোপুরি এবং ৫৫টি আংশিক বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতিরও প্রায় অর্ধেক এখনো অধরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান সমস্যা আবাসন সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী হলে থাকার সুযোগ পান না। নির্বাচনের আগে হল সংস্কার, নতুন ভবন নির্মাণ ও আসন বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এক বছরে মাত্র তিনটি হলের বর্ধিত অংশ সংস্কার করে ১৯৭ জন শিক্ষার্থীর আবাসনের ব্যবস্থা করা গেছে। পরিবহনের ক্ষেত্রেও বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। শাটল ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো, ট্র্যাকার অ্যাপ চালু বা শহর ও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে নতুন বাস সার্ভিস চালুর প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। কেবল একটি শাটলের বগি সংস্কার এবং অন্যটির বগি পরিবর্তন করা হয়েছে।
চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও একই স্থবিরতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারকে ৩০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তর, চিকিৎসক ও অ্যাম্বুলেন্স বৃদ্ধি এবং অস্ত্রোপচারকক্ষ স্থাপনের কোনো প্রতিশ্রুতিই পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। এছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, চাইল্ড কেয়ার ও দুগ্ধপান কর্নার-সংবলিত কমনরুমের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। টিএসসি, কেন্দ্রীয় মিলনায়তন নির্মাণ, অন-ক্যাম্পাস কর্মসংস্থান ও শরীরচর্চার পর্যাপ্ত সুবিধার মতো অঙ্গীকারগুলো এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে। নাট্যকলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইমা আক্তার ও ক্রিমিনোলজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের গালিব কবীর জানান, আবাসন, পরিবহন, চিকিৎসা ও খাবার নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রধান সমস্যাগুলো এখনো দূর হয়নি। শাটলের সূচি বিপর্যয় ও চিকিৎসাকেন্দ্রে ওষুধ-চিকিৎসকের ঘাটতি শিক্ষার্থীদের ভোগাচ্ছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ক্যাম্পাসের প্রত্যাশাও পুরোপুরি পূরণ হয়নি বলে তাঁরা অভিযোগ করেন।
তবে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। খাবারের মান ও মূল্য তদারকির জন্য ফুড সেল গঠন, শিক্ষার্থীদের অফিশিয়াল ই-মেইল প্রদান, লিগ্যাল এইড সেল গঠন এবং উচ্চশিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে কর্মশালা করা হয়েছে। এছাড়া যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কিছু ব্যবস্থা এবং গবেষণা ও গ্রিন ক্যাম্পাস তৈরিতে আংশিক কাজ হয়েছে। চাকসুর ভিপি মো. ইব্রাহীম হোসেনের দাবি, আবাসন ও পরিবহন ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে। তিনি জানান, নতুন শাটল ও বাস যুক্ত না হলেও পুরোনো শাটল সংস্কার, ১৪টি ইকো কার ও রাতে বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জিএস সাঈদ বিন হাবিবও দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধানে তাঁরা সবসময় সক্রিয় ছিলেন এবং মেয়াদের বাকি সময়ে আরও কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
এদিকে চাকসুর কার্যক্রমে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রদলের প্যানেল থেকে একমাত্র বিজয়ী এজিএস আইয়ুবুর রহমান অভিযোগ করেন, শুরু থেকেই তাঁকে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। কোনো কর্মসূচি বা বিবৃতিতে তাঁর মতামত নেওয়া হয়নি এবং চাকসুর ব্যয় সংক্রান্ত তথ্যও তাঁকে জানানো হয়নি। এমনকি চাকসুর ফেসবুক পেজ কারা চালায়, তা-ও তিনি জানেন না। তবে ভিপি ও জিএস এই অভিযোগ নাকচ করে দাবি করেছেন, প্রত্যেক প্রতিনিধি স্বাধীনভাবে কাজ করছেন এবং সবার জন্য আলাদা বাজেট বরাদ্দ রয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা চাকসুর কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমান অভিযোগ করেন, চাকসু প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের এজেন্ডার চেয়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক সুদর্শন চাকমাও মনে করেন, মৌলিক সমস্যা সমাধানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা প্রশাসনকে চাপ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন জানান, প্রশাসন চাকসুকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। চাকসুর সভাপতি ও উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, আবাসন সংকটের মতো বড় সমস্যা দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। তবে প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি টাকার একটি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) শিগগিরই জমা দেওয়া হবে, যেখানে পাঁচটি ১০ তলা হল নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। বাজেটের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, চাকসুর ৮ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটের পুরোটা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরবর্তী নির্বাচন প্রসঙ্গে উপাচার্য জানান, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে যথাসময়ে নির্বাচনের চেষ্টা থাকবে। তবে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে চাকসু নির্বাচন যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বার্ষিক বাজেটে এর কোনো বরাদ্দ না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ভিপি ইব্রাহীম হোসেন। সপ্তম চাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক মনির উদ্দিন সতর্ক করে বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এক বছর শেষে সংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হবে। নতুন নির্বাচন না হলে শিক্ষার্থীদের দাবি তোলার মতো কোনো প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামো থাকবে না।





























