ভারতকে পেছনে ফেলে বাণিজ্যে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এল যুক্তরাষ্ট্র
- আপডেট সময় : ০২:১৯:৩৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

ভৌগোলিক সুবিধা, কম খরচ ও স্থলপথের সহজ যোগাযোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। তবে দীর্ঘ ১৬ বছর পর সেই চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। ভারতকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে, বিশাল ব্যবধানে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি এবং ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার কারণে এই পটপরিবর্তন ঘটেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর ফলে ভালো মানের পণ্য পাওয়া গেলেও সামগ্রিক ব্যয় কিছুটা বেড়ে যাচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৬৭ কোটি ডলার। বিপরীতে, ভারতের সঙ্গে এই বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১ হাজার colar ৭২ কোটি ডলার। অর্থাৎ, ভারতের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের ১৯৫ কোটি ডলার বেশি বাণিজ্য হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ার কারণে দেশটির সঙ্গে মোট বাণিজ্য বেড়েছে, বিশেষ করে সরকারি কেনাকাটায় এই প্রবৃদ্ধি বেশি দেখা গেছে। তবে পোশাক রপ্তানিতে প্রতিশ্রুত বিশেষ শুল্কসুবিধা এখনো কার্যকর হয়নি। অন্যদিকে, দুই দেশের অশুল্ক বাধার কারণে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমেছে, যা ভোক্তা ও উৎপাদক উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল ৬২৬ কোটি ডলার, যা পরের অর্থবছরে আমদানি বাড়ার কারণে কমে ৫৫৫ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৯১১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে এবং আমদানি করেছে ৩৫৬ কোটি ডলারের পণ্য। আমদানি বাড়ার পেছনে দুই দেশের পাল্টা শুল্ক সংক্রান্ত আলোচনা বড় ভূমিকা রেখেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যা ৭ আগস্ট কার্যকর হয়। পরে কয়েক দফা আলোচনার পর চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে একটি পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি সই হয়, যেখানে শুল্ক ১৯ শতাংশে নামানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য, ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য, ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অঙ্গীকার করে। এর অংশ হিসেবে গত ৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করে এবং আরও ১১টি কেনার আলোচনা চলছে। যদিও চুক্তির ১১ দিন পর ২০ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপকে অবৈধ ঘোষণা করে, তবে চুক্তিটি এখনো বহাল রয়েছে।
বাণিজ্যচুক্তি বাস্তবায়নের আগেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেনাকাটা বাড়ায়। সরকারি পর্যায়ে গম ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং বেসরকারি পর্যায়ে সয়াবিনবীজ ও তুলা আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এনবিআরের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোনো গম আমদানি না হলেও গত অর্থবছরে ২২ কোটি ৭৭ লাখ ডলারের গম এসেছে। সয়াবিনবীজ আমদানি ৩৫ কোটি থেকে বেড়ে ৬২ কোটি এবং তুলা আমদানি ২৩ কোটি থেকে ৩৮ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া সরকারি খাতে এলএনজি আমদানি হয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি ডলারের। ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট আমদানি ৪৩ শতাংশ বেড়ে ২৪৯ কোটি থেকে ৩৫৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি খাতের শীর্ষ আমদানিকারক মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিতে বাণিজ্যসুবিধা বেড়েছে এবং মান অনুযায়ী দামও প্রতিযোগিতামূলক ছিল। দ্বিতীয় শীর্ষ আমদানিকারক সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের মান ভালো এবং সরবরাহ নিশ্চিত। সংঘাতের কারণে ইউক্রেনসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানির ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ায় তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা বাড়িয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়লেও ভারতের ক্ষেত্রে চিত্রটি উল্টো। গত অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি সাড়ে ৭ শতাংশ কমে ৮৯৬ কোটি ডলারে নেমেছে এবং রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩ শতাংশ। মোট বাণিজ্য ৭৭ কোটি ডলার কমে ১ হাজার ৭২ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে বাংলাদেশ সরকার স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ৮ এপ্রিল ভারত কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্যের তৃতীয় দেশে রপ্তানি সুবিধা প্রত্যাহার করে। এছাড়া ভারত তিন দফায় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে, যার মধ্যে পোশাক, পাটপণ্য, তুলা ও সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিক ও কাঠের আসবাব রয়েছে। এসবের ফলে ভারতের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ১২ শতাংশ কমে ৫৭ কোটি ডলারে নেমেছে। ভারত থেকে তুলা আমদানি ২৩ শতাংশ কমে ৪০ কোটি এবং সুতা আমদানি ১৭৫ কোটি থেকে ১৪৭ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে পরিবর্তন এলেও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে চীন। গত অর্থবছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্য হয়েছে ২ হাজার ২৯৬ কোটি ডলারের, যা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ৮১ শতাংশ বেশি। চীন থেকে মূলত আমদানির পরিমাণই বেশি, যা ছিল ২ হাজার ২১৪ কোটি ডলার (বৃদ্ধি ৭%)। বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে ৮২ কোটি ডলার (বৃদ্ধি ১১%)। গত অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পণ্য আমদানি ছিল ৭ হাজার ৩১২ কোটি ডলার এবং রপ্তানি ছিল ৪ হাজার ৬২৬ কোটি ডলার। মোট ১১ হাজার ৯৩৮ কোটি ডলারের বাণিজ্যের মধ্যে চীনের অংশ ১৯ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্রের ১১ শতাংশ এবং ভারতের ৯ শতাংশ। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোয় দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি কমছে, যা ভবিষ্যতে শুল্ক আরোপের ঝুঁকি কমাবে। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য কমার বিষয়ে তিনি বলেন, পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীন ও ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্য মূলত রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল হওয়ায় শুধু বাণিজ্যঘাটতি দিয়ে এর বিচার করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যের সুফল পেতে প্রতিশ্রুত শুল্কসুবিধা দ্রুত কার্যকর করা জরুরি।



























