কওমি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা: জবাবদিহি ও সংস্কারের তাগিদ
- আপডেট সময় : ০৮:২৭:৫১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬ বার পড়া হয়েছে

কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সেখানে শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়। কোনো শিশু নির্যাতনের শিকার হলে আলোচনাটি কেবল ব্যক্তির নৈতিক পতন বা পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ঢালাও বিষোদ্গারের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই দ্বিমুখী সংকটের সমাধান এবং মাদ্রাসায় শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং গবেষক মুসা আল হাফিজের মতে, শিশু নির্যাতন কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা প্রতিষ্ঠানের একক সমস্যা নয়; এটি পরিবার, স্কুল ও ক্রীড়া সংগঠনসহ সবখানেই ঘটে। তবে কওমি মাদ্রাসার আবাসিক পরিবেশ, ক্ষমতার অসমতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির অভাব অপরাধীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। বিশেষ করে হিফজ ও নুরানি বিভাগের মতো নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে এ ধরনের অপরাধের ঝুঁকি বেশি থাকে।
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তা শিশু সুরক্ষার প্রকৃত তদারকির সমকক্ষ নয়। পড়াশোনা বা শিক্ষকের ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি কোনো শিক্ষক কোনো শিশুকে নিয়মিত একান্তে ডাকছেন কি না, অভিযোগের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা কী হবে এবং শিশুর মনোসামাজিক সহায়তা কীভাবে নিশ্চিত হবে—তা জানা জরুরি। আবাসিক ব্যবস্থাপনায় শিক্ষকেরা অভিভাবকের বিকল্প হয়ে ওঠায় ক্ষমতার যে অসমতা তৈরি হয়, তা অনেক সময় শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই ঝুঁকি এড়াতে শিক্ষক ও আবাসিক তত্ত্বাবধায়কদের দায়িত্বের রোটেশন, রাতের ডিউটির ভারসাম্য এবং ছুটির লিখিত রেকর্ড রাখা প্রয়োজন।
নির্যাতনের শিকার শিশুরা প্রায়ই ভয়, লজ্জা বা বিভ্রান্তির কারণে নীরব থাকে। অনেক সময় অভিযোগ ওঠার পর প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় শিশুর বিপরীতে অবস্থান নেয়, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। গুরুতর নির্যাতন কোনো সাধারণ সামাজিক বিরোধ নয় যে তা স্থানীয় সালিসের মাধ্যমে আপস করা যাবে। অভিযোগ উঠলে প্রথম কাজ হলো শিশুকে নিরাপদ করা, তদন্ত চলাকালে অভিযুক্তকে শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা, প্রমাণ সংরক্ষণ ও আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল ধর্মীয় যোগ্যতা যথেষ্ট নয়। নিয়োগের আগে পরিচয় ও অপরাধের ইতিহাস যাচাইয়ের পাশাপাশি শিক্ষকদের শিশু মনোবিজ্ঞান, নির্যাতনের লক্ষণ ও আইনি দায়িত্ব নিয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় লিখিত শিশু সুরক্ষা নীতি, প্রশিক্ষিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং নিরাপদ অভিযোগের পথ থাকা উচিত। সাধারণ স্থানগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা যেতে পারে, তবে শোবার ঘর বা বাথরুমে নয়। একই সঙ্গে শিশুদের বয়সোপযোগীভাবে স্পর্শ ও অনিরাপদ আচরণ সম্পর্কে সচেতন করা এবং অভিভাবকদের নিয়মিত সন্তানের আচরণের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন।
কওমি মাদ্রাসার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই আলেমদের সঙ্গে শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী ও আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন তদারকি কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। কওমি বোর্ডগুলো অভিন্ন ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করে বার্ষিক আত্মমূল্যায়ন ও ঝুঁকি নিরীক্ষা করতে পারে। যে মাদ্রাসা অভিযোগ গোপন করবে বা অপরাধীকে পালাতে সাহায্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে বোর্ডের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পরিশেষে, ভুক্তভোগী শিশুর চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও সামাজিক কলঙ্ক থেকে সুরক্ষাও নিশ্চিত করা আবশ্যক। কওমি সমাজের নিজস্ব নৈতিক ঐতিহ্য—আমানত, তাকওয়া ও আত্মবিচারের আলোকেই এই সংস্কার বাস্তবায়ন করা সম্ভব।





























