ঢাকা ১২:০০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব হলেন নোমান মাহমুদ হাইকোর্টের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে শপথ নিলেন দেবাশীষ রায় চৌধুরী বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ছাত্র কল্যাণ পরিষদের নবীনবরণ ও বিদায় কুমিল্লায় কিশোর গ্যাং দমনে একরাতে ৬২৪ জন আটক বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সব কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দেশের বাজারে ফের বাড়ল স্বর্ণের দাম বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও রুপার দামে বড় পতন এআই-এর যুগেও নিজের অবস্থানে অনড় ‘লিপস্টিক কিং’ লি জিয়াকি টেকনাফে কাউন্সিলর একরামুল হত্যা: শেখ হাসিনাসহ ১১ জনের শুনানি আজ যুক্তরাষ্ট্রে শি জিনপিংকে লাল গালিচা অভ্যর্থনা, আলোচনায় বাণিজ্যসহ নানা ইস্যু

মোবাইল ফোন কি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি আমরা ব্যবহার করছি?

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৩:৫৭:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



সকালে ঘুম ভাঙার পর আপনার প্রথম কাজ কী? অনেকের উত্তর হবে, মোবাইল ফোন হাতে নেওয়া। প্রশ্ন হলো, আমরা কি মোবাইল ব্যবহার করছি, নাকি মোবাইলই আমাদের ব্যবহার করছে? বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারের ব্যাপকতা এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (AMTOB)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস শেষে দেশে সক্রিয় মোবাইল সাবস্ক্রাইবার ছিল প্রায় ১৮ কোটি ৮৬ লাখ এবং মোবাইল ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবার প্রায় ১১ কোটি ৯১ লাখ। যদিও একজনের একাধিক সিম থাকার কারণে এই সংখ্যা সরাসরি মানুষের সংখ্যা নয়, তবুও এটি আমাদের ডিজিটাল নির্ভরতার বিশাল চিত্রটি সামনে আনে। প্রযুক্তির এই বিস্তার নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে, কিন্তু পাশাপাশি তৈরি হয়েছে একটি নীরব সংকট—অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার এবং মোবাইল-নির্ভরতা।

প্রয়োজন আর আসক্তির মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। একজন শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস করছে, ব্যবসায়ী গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, কৃষক আবহাওয়ার তথ্য নিচ্ছেন কিংবা একজন প্রবাসী পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছেন—এসব প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন প্রয়োজনের বাইরে মোবাইল আমাদের সময়, মনোযোগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। 'মাত্র পাঁচ মিনিট দেখব'—এই পাঁচ মিনিট কখনো কখনো এক ঘণ্টায় পরিণত হয়। একটি ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই অন্যটি, একটি পোস্টের পর আরেকটি, একটি রিল শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী রিল প্রস্তুত থাকে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, পড়াশোনা, কাজ, ঘুম, পরিবার কিংবা বিশ্রামের জন্য বরাদ্দ সময়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে স্ক্রিনের পেছনে।

অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের অন্যতম বড় ক্ষতি হলো মনোযোগের বিভাজন। অফিসের কাজে রিপোর্ট তৈরির সময় কিংবা বই খুলে পড়ার সময় ফোনের নোটিফিকেশন আমাদের মনোযোগ টুকরো টুকরো করে ভেঙে দেয়। ফলে কাজের গতি কমে, ভুলের সম্ভাবনা বাড়ে এবং গভীর মনোযোগের প্রয়োজন এমন কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে পারিবারিক জীবনেও আমরা উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত। ঘরে বাবা, মা ও সন্তান সবাই আছেন, কিন্তু প্রত্যেকে নিজের নিজের মোবাইলের জগতে। একসঙ্গে থাকা আর একসঙ্গে সময় কাটানো এক বিষয় নয়। অনেক সময় বাবা-মা সন্তানকে ব্যস্ত রাখতে হাতে মোবাইল তুলে দেন, যা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে শিশুর সঙ্গে কথোপকথন, খেলা ও আবেগের সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে।

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। প্রযুক্তির শিক্ষামূলক সুযোগের পাশাপাশি অনলাইন বুলিং, প্রতারণা, ভুয়া তথ্য, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। তাই তাদের শুধু স্মার্টফোন দিলেই হবে না, ডিজিটালভাবে সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তোলা প্রয়োজন। সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অনলাইন যোগাযোগ বাস্তব জীবনের যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। মানুষ শত শত অনলাইন 'ফ্রেন্ড' নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও পাশের বাসার মানুষের খবর রাখে না। অন্যের জীবনের ছবি দেখে নিজের জীবন নিয়ে তুলনা ও হতাশা তৈরি হওয়াও এখন সাধারণ বিষয়।

সম্প্রতি পটুয়াখালীর দশমিনায় একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে এক বাবা তার দেড় বছরের শিশুকে এক লাখ টাকা দিয়ে বিক্রি করে আইফোন কিনেছিলেন। যদিও পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করেছে এবং ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু ঘটনাটি আমাদের সামনে কঠিন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছে। একটি প্রযুক্তিপণ্য কখন মানুষের প্রয়োজনের বাইরে গিয়ে আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়? একটি ফোন কি কখনো মানুষের সম্পর্ক, দায়িত্ব কিংবা মূল্যবোধের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে? 'আমি কি আমার ফোনকে নিয়ন্ত্রণ করি, নাকি আমার ফোন আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে?'—এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রত্যেককে নিজের জীবন থেকেই খুঁজে নিতে হবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin

নিউজটি শেয়ার করুন

মোবাইল ফোন কি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, নাকি আমরা ব্যবহার করছি?

আপডেট সময় : ০৩:৫৭:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সকালে ঘুম ভাঙার পর আপনার প্রথম কাজ কী? অনেকের উত্তর হবে, মোবাইল ফোন হাতে নেওয়া। প্রশ্ন হলো, আমরা কি মোবাইল ব্যবহার করছি, নাকি মোবাইলই আমাদের ব্যবহার করছে? বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারের ব্যাপকতা এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (AMTOB)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস শেষে দেশে সক্রিয় মোবাইল সাবস্ক্রাইবার ছিল প্রায় ১৮ কোটি ৮৬ লাখ এবং মোবাইল ইন্টারনেট সাবস্ক্রাইবার প্রায় ১১ কোটি ৯১ লাখ। যদিও একজনের একাধিক সিম থাকার কারণে এই সংখ্যা সরাসরি মানুষের সংখ্যা নয়, তবুও এটি আমাদের ডিজিটাল নির্ভরতার বিশাল চিত্রটি সামনে আনে। প্রযুক্তির এই বিস্তার নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে, কিন্তু পাশাপাশি তৈরি হয়েছে একটি নীরব সংকট—অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার এবং মোবাইল-নির্ভরতা।

প্রয়োজন আর আসক্তির মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। একজন শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাস করছে, ব্যবসায়ী গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন, কৃষক আবহাওয়ার তথ্য নিচ্ছেন কিংবা একজন প্রবাসী পরিবারের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলছেন—এসব প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার। সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন প্রয়োজনের বাইরে মোবাইল আমাদের সময়, মনোযোগ ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। 'মাত্র পাঁচ মিনিট দেখব'—এই পাঁচ মিনিট কখনো কখনো এক ঘণ্টায় পরিণত হয়। একটি ভিডিও শেষ হওয়ার আগেই অন্যটি, একটি পোস্টের পর আরেকটি, একটি রিল শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী রিল প্রস্তুত থাকে। শেষ পর্যন্ত দেখা যায়, পড়াশোনা, কাজ, ঘুম, পরিবার কিংবা বিশ্রামের জন্য বরাদ্দ সময়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে স্ক্রিনের পেছনে।

অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহারের অন্যতম বড় ক্ষতি হলো মনোযোগের বিভাজন। অফিসের কাজে রিপোর্ট তৈরির সময় কিংবা বই খুলে পড়ার সময় ফোনের নোটিফিকেশন আমাদের মনোযোগ টুকরো টুকরো করে ভেঙে দেয়। ফলে কাজের গতি কমে, ভুলের সম্ভাবনা বাড়ে এবং গভীর মনোযোগের প্রয়োজন এমন কাজ কঠিন হয়ে পড়ে। একইভাবে পারিবারিক জীবনেও আমরা উপস্থিত থেকেও অনুপস্থিত। ঘরে বাবা, মা ও সন্তান সবাই আছেন, কিন্তু প্রত্যেকে নিজের নিজের মোবাইলের জগতে। একসঙ্গে থাকা আর একসঙ্গে সময় কাটানো এক বিষয় নয়। অনেক সময় বাবা-মা সন্তানকে ব্যস্ত রাখতে হাতে মোবাইল তুলে দেন, যা সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে শিশুর সঙ্গে কথোপকথন, খেলা ও আবেগের সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে।

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। প্রযুক্তির শিক্ষামূলক সুযোগের পাশাপাশি অনলাইন বুলিং, প্রতারণা, ভুয়া তথ্য, ক্ষতিকর কনটেন্ট এবং ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। তাই তাদের শুধু স্মার্টফোন দিলেই হবে না, ডিজিটালভাবে সচেতন ও দায়িত্বশীল করে তোলা প্রয়োজন। সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অনলাইন যোগাযোগ বাস্তব জীবনের যোগাযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। মানুষ শত শত অনলাইন 'ফ্রেন্ড' নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও পাশের বাসার মানুষের খবর রাখে না। অন্যের জীবনের ছবি দেখে নিজের জীবন নিয়ে তুলনা ও হতাশা তৈরি হওয়াও এখন সাধারণ বিষয়।

সম্প্রতি পটুয়াখালীর দশমিনায় একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে এক বাবা তার দেড় বছরের শিশুকে এক লাখ টাকা দিয়ে বিক্রি করে আইফোন কিনেছিলেন। যদিও পুলিশ শিশুটিকে উদ্ধার করেছে এবং ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু ঘটনাটি আমাদের সামনে কঠিন কিছু প্রশ্ন রেখে গেছে। একটি প্রযুক্তিপণ্য কখন মানুষের প্রয়োজনের বাইরে গিয়ে আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রে পরিণত হয়? একটি ফোন কি কখনো মানুষের সম্পর্ক, দায়িত্ব কিংবা মূল্যবোধের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে? 'আমি কি আমার ফোনকে নিয়ন্ত্রণ করি, নাকি আমার ফোন আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে?'—এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রত্যেককে নিজের জীবন থেকেই খুঁজে নিতে হবে।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin