ভালো সিদ্ধান্ত নিতে চান? সাহায্য নিতে পারেন ৫ ক্ষুদ্র পতঙ্গের কাছ থেকে
- আপডেট সময় : ০৬:৫৭:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ ৭ বার পড়া হয়েছে

মানুষ নিজেকে সৃষ্টির সেরা ও সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে দাবি করলেও, জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে প্রায়ই খেই হারিয়ে ফেলে। অতিরিক্ত চিন্তা, আবেগ কিংবা পুরোনো ধ্যানধারণার কারণে অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে বসি আমরা। অথচ আমাদের চারপাশের অতি ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের কিছু পোকামাকড় চমৎকার ও নিখুঁতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দারুণ পারদর্শিতা দেখায়। তাদের এই দলগত ও একক আচরণ বিজ্ঞানীদেরও অবাক করেছে, যা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হচ্ছে আধুনিক পরিবহন, যোগাযোগ ও ব্যবসা পরিচালনার নতুন নতুন অ্যালগরিদম।
খাবারের সন্ধান পাওয়ার ক্ষেত্রে পিঁপড়েদের কৌশল আমাদের শেখায় কীভাবে অনেকগুলো বিকল্পের মধ্য থেকে সেরাটি বেছে নিতে হয়। দল বেঁধে খাবার খুঁজতে বের হওয়ার সময় পিঁপড়েরা মাটিতে এক ধরণের রাসায়নিক পদার্থ বা ফেরোমোন ছড়িয়ে যায়। যে পিঁপড়েটি দ্রুত খাবারের সন্ধান পায়, সে দ্রুত বাসায় ফিরে আসে এবং তার পথটিতে ফেরোমোনের মাত্রা বাড়তে থাকে। এর ফলে অন্য পিঁপড়েরাও সেই পথটি অনুসরণ করে এবং একসময় সবচেয়ে ছোট ও কার্যকর পথটিই মূল রাস্তা হিসেবে নির্ধারিত হয়। এই 'অ্যান্ট কলোনি অপ্টিমাইজেশন' পদ্ধতি বর্তমানে রেলওয়ে নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হচ্ছে। মানুষের জন্য এখানে শিক্ষা হলো, সব সিদ্ধান্ত একবারে না নিয়ে প্রথমে কয়েকটি বিকল্প পরীক্ষা করা এবং পরে সফল পথটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
নতুন বাসা নির্বাচনের ক্ষেত্রে মৌমাছিদের চমৎকার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রয়েছে। তাদের কিছু অনুসন্ধানী মৌমাছি প্রথমে বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করে। ফিরে এসে তারা এক বিশেষ ধরণের 'ওয়াগল ড্যান্স' বা নাচের মাধ্যমে সেই জায়গার দূরত্ব, দিক ও মান সম্পর্কে অন্যদের অবহিত করে। জায়গাটি যত ভালো হয়, নাচের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব তত বেশি হয়। পরবর্তীতে অন্য মৌমাছিরা সেখানে গিয়ে তথ্য যাচাই করে এবং পর্যাপ্ত সমর্থন মিললে তবেই জায়গাটি চূড়ান্ত করা হয়। কোনো একক নেতার নির্দেশে নয়, broth সম্মিলিত তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত মানুষের জন্য একটি বড় শিক্ষা—ভালো সিদ্ধান্তের জন্য অন্যের মতামত শোনা ও তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
কোনো বিষয়ে দল যখন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন পঙ্গপালের আচরণ থেকে সমাধান খোঁজা যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, চলন্ত পঙ্গপালের দল কখনো কখনো হঠাৎ কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ায় বা কোনো পক্ষ নেওয়া থেকে বিরত থাকে। এই সাময়িক নিরপেক্ষতা তাদের পুরোনো সিদ্ধান্ত বদলে নতুন পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। মানুষের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, কোনো পক্ষ না নিয়ে কিছুটা সময় বিরতি দেওয়া বা নতুন করে ভাবা অনেক সময় সঠিক সিদ্ধান্তের পথ খুলে দেয়।
একটি দলে সবার চিন্তাভাবনা একই রকম হলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হলেও তা সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে। তেলাপোকার ওপর করা একটি গবেষণা এই ধারণাকে সমর্থন করে। কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে গবেষকেরা দেখেছেন, তেলাপোকাদের দলে কিছু সাহসী ও অনুসন্ধানী এবং কিছু ভীতু সদস্যের মিশ্রণ থাকলে তারা দ্রুত ও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে নিতে পারে। সবাই অতিরিক্ত সাহসী হলে কেউ এক জায়গায় স্থির হতে চায় না, আবার সবাই ভীতু হলে দ্রুত আশ্রয় নিলেও তা ভালো জায়গা হয় না। অর্থাৎ, একটি সফল দলে ভিন্ন ভিন্ন স্বভাবের মানুষের উপস্থিতি বা বৈচিত্র্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও সমৃদ্ধ ও বুদ্ধিদীপ্ত করে তোলে।
এছাড়া ফলমাছি বা ফ্রুট ফ্লাইয়ের মতো সাধারণ প্রাণীও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে বিবেচনায় রাখে। দুটি গন্ধের পার্থক্য কম হলে তারা সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় নেয় এবং খাবারের পুষ্টি ও স্বাদের তুলনা করে সামগ্রিক মূল্য নির্ধারণ করে। তবে ক্ষুধার্ত বা চাপের মুখে থাকা মাছিরা অনেক সময় বেশি ঝুঁকি নেয়। মানুষের ক্ষেত্রেও ক্ষুধা, ক্লান্তি কিংবা মানসিক চাপ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তাই ভালো সিদ্ধান্তের জন্য কেবল বাইরের তথ্য নয়, নিজের মানসিক পরিস্থিতি বোঝাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মূলত, ক্ষুদ্র এই প্রাণীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সম্মিলিত আলোচনা, সাময়িক বিরতি, দলের বৈচিত্র্য ও আত্মসচেতনতার এই কৌশলগুলো মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও নিখুঁত করতে সাহায্য করতে পারে।





























