মেরুপথে রাশিয়া-চীন বাণিজ্য বৃদ্ধি: উদ্বেগে পশ্চিমা বিশ্ব
- আপডেট সময় : ০৭:১৪:৫২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

মার্কিন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে বিকল্প পথ হিসেবে সুমেরু অঞ্চলকে বেছে নিয়েছে মস্কো ও বেইজিং। মে মাসের শেষদিকে যখন রাশিয়ার সুদূর উত্তরের সুমেরু অঞ্চলে বরফ পুরোপুরি গলেনি, ঠিক তখনই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ‘ক্রিস্টোফ মার্জারি’ নামের একটি বিশাল এলএনজি ট্যাঙ্কার ‘উত্তর সাগরের নৌপথ’ ধরে যাত্রা শুরু করে। রাশিয়ার আর্কটিক এলএনজি-২ প্রকল্প থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করে বরফভাঙা জাহাজের সহায়তায় হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এটি কামচাটকা উপদ্বীপে পৌঁছায়। পরদিন একইভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপর একটি ট্যাঙ্কার ‘আর্কটিক মুলান’ সেই জ্বালানি নিয়ে চীনের বেইহাই বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এই ঘটনাটি রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।
রাশিয়ার প্রায় সাড়ে তিন হাজার মাইল দীর্ঘ উপকূলজুড়ে বিস্তৃত এই মেরু নৌপথটিকে একটি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক করিডর হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার উচ্চাভিলাষী ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের অংশ হিসেবে একটি ‘মেরু রেশম পথ’ তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার আর্কটিক প্রকল্পগুলো থেকে তাদের বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বেইজিংয়ের সামনে এক বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে চীন এখন মস্কোর জ্বালানি খাতের একক বৃহত্তম অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর হাই নর্থ লজিস্টিকস’-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই রুটে পরিচালিত আন্তর্জাতিক ট্রানজিটের প্রায় পুরোটাই এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে চীন। চলতি বছরের প্রথমার্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইরান সামরিক সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে রাশিয়া থেকে চীনের এলএনজি আমদানির পরিমাণ প্রায় ২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। কেবল জ্বালানি নয়, পণ্য পরিবহনেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এই রুটে ব্যাপক তৎপরতা দেখাচ্ছে। ‘সি লিজেন্ড’ এবং ‘নিউ নিউ শিপিং’-এর মতো উদীয়মান চীনা শিপিং কোম্পানিগুলো এই মৌসুমে চীন থেকে ইউরোপ ও রাশিয়ার প্রধান বন্দরগুলোতে নিয়মিত কনটেইনার সার্ভিস চালু করেছে。
তবে সুমেরু অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার এই ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নীতি নিয়ে চরম সামরিক উত্তেজনার মাঝে এই সুমেরু অভিযান ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে গ্রিনল্যান্ডের কাছে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং মার্কিন আইসব্রেকার বা বরফভাঙা নৌবহর পুনর্গঠনের ওপর জোর দিয়েছেন। অন্যদিকে, ন্যাটোপ্রধান মার্ক রুটে ও ক্যাজা ক্যালাস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, বেইজিং সুমেরু অঞ্চলের নৌপথ ও তার কৌশলগত অবস্থানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এমনকি চীনা বৈজ্ঞানিক গবেষণা মিশনগুলোর আড়ালে সামরিক তথ্য সংগ্রহের আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে, যদিও বেইজিং এসব অভিযোগকে ‘চীনভীতি’ ছড়ানোর অপচেষ্টা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সামুদ্রিক পরিবেশের ঝুঁকি এবং বছরের সীমিত সময় বরফ গলে থাকার কারণে আর্কটিক রুটের বাণিজ্যিক স্থায়িত্ব নিয়ে কিছু প্রশ্ন এখনও রয়ে গেছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরফ গলে নতুন নৌপথ উন্মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।




























