ভিয়েতনামের ইলেকট্রনিক্স সাফল্যের শিক্ষা ও বাংলাদেশের করণীয়
- আপডেট সময় : ০৬:২৪:৪৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আমাদের দ্রুত, সমন্বিত ও শেখার উপযোগী হতে হবে। তবে ভিয়েতনামের সাফল্যের গল্প শুধু শোনালেই হবে না, আমাদের নিজেদের রূপান্তরের গল্প তৈরি করতে হবে। কয়েক দিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সাথে ব্যবসায়ীদের বৈঠকে ভিয়েতনামের রপ্তানি বৈচিত্র্যের সাফল্যের প্রসঙ্গটি উঠে এসেছিল। প্রশ্ন হলো, ভিয়েতনাম ঠিক কী করেছিল, যা বাংলাদেশ করতে পারেনি?
তিন দশক আগে ইলেকট্রনিক পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ ও ভিয়েতনাম প্রায় সমান অবস্থানে ছিল। উভয় দেশই তখন মোট রপ্তানির ১ শতাংশের কম বা প্রায় তিন কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করত। আজ ভিয়েতনামের মোট রপ্তানির প্রায় ৪০ শতাংশ আসে ইলেকট্রনিক খাত থেকে এবং দেশটি বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ রপ্তানিকারক। অথচ বাংলাদেশ এখনো সেই পুরনো অবস্থানেই রয়ে গেছে। ভিয়েতনামের এই সাফল্য কোনো একক মহাপরিকল্পনার ফল নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির সাথে যুক্ত হওয়ার সম্মিলিত প্রয়াস।
প্রথম শিক্ষা হলো দক্ষতা ও শেখার ক্ষমতা। ভিয়েতনামের তথ্যপ্রযুক্তি প্রকৌশলীরা স্যামসাংয়ের ব্যবহৃত সফটওয়্যারের প্রায় ১০ শতাংশ তৈরি করেন এবং হ্যানয়ে তাদের দেড় হাজারের বেশি উচ্চ দক্ষ কর্মী কাজ করেন। তবে ভিয়েতনামের নীতিনির্ধারকেরা এখনো দক্ষ জনশক্তির ঘাটতিকে বড় সমস্যা মনে করেন। তারা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির ওপর নয়, বরং কর্মীর নতুন দক্ষতা আয়ত্ত করার সামর্থ্য, দলবদ্ধভাবে কাজ করা এবং সমস্যার সমাধানের ক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেন।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ব সংযুক্ত বাণিজ্যব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই ভিয়েতনাম বিদেশি বিনিয়োগকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারা ১৯৯৬ সালে আসিয়ানের মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল (এএফটিএ), ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি, ২০০৬ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এবং ২০১৭ সালে সিপিটিপিপিতে যুক্ত হয়েছে। এর ফলে তাদের রপ্তানি পণ্য প্রতিযোগিতামূলক হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ এখনো জিডিপির ২ শতাংশের নিচে।
তৃতীয় শিক্ষা হলো সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ। আজ ভিয়েতনামের মোট রপ্তানির প্রায় ৭০ শতাংশ আসে বিদেশি কোম্পানিগুলো থেকে। স্যামসাংয়ের কথাই ধরা যাক—১৯৯৬ সালে তারা ভিয়েতনামে প্রথম বিনিয়োগ করে। ২০০৯ সালে বাক নিন প্রদেশে ৬৭০ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানিমুখী মুঠোফোন কারখানা স্থাপনের পর দৃশ্যপট বদলে যায়। ২০১৭ সাল নাগাদ স্যামসাং সেখানে ১৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এবং ১ লাখের বেশি কর্মসংস্থান তৈরি করে, যা দেশটিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। ইন্টেলও হো চি মিন সিটিতে এক বিলিয়ন ডলারের সেমিকন্ডাক্টর কেন্দ্র গড়ে তুলেছে।
চতুর্থত, শিল্প খাতের জন্য উপযোগী জমি সরবরাহ। দেড় দশক আগে স্যামসাং বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগে আগ্রহী হলেও আমরা পর্যাপ্ত আয়তনের জমি নিশ্চিত করতে পারিনি। বড় ইলেকট্রনিকস কারখানার জন্য অসংখ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি থাকা প্রয়োজন, যার জন্য বড় জমির প্রয়োজন হয়।
পোশাকশিল্পের ইতিহাসে দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ডেউ’-এর সাথে দেশ গার্মেন্টসের অংশীদারত্ব আমাদের নতুন শিল্প-পরিবেশের শিক্ষা দিয়েছিল। এক দশকের বেশি আগে স্যামসাংয়ের ক্ষেত্রেও তেমন একটি সুযোগ এসেছিল, কিন্তু আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি। ভিয়েতনামকে হুবহু অনুকরণ করা সম্ভব নয়, তবে তাদের মতো দক্ষতা বৃদ্ধি, উন্মুক্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, স্যামসাংয়ের মতো প্রতিষ্ঠান আমাদের ইতিহাসে কেবল হারিয়ে ফেলা সম্ভাবনার প্রতীক হয়েই থাকবে। ইতিহাস বলবে—তারা এসেছিল, কিন্তু আমরা প্রস্তুত ছিলাম না।





























