রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ৭০ অনুচ্ছেদের প্রয়োগ: সাংবিধানিক অস্পষ্টতা ও আইনি বিতর্ক
- আপডেট সময় : ০১:২০:২৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশনকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি প্রার্থীদের জয়-পরাজয় নয়, বরং একজন সংসদ সদস্য যদি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেন, তবে তাঁর আসন শূন্য হবে কি না—সেই বিষয়টি। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি দাবি করেছেন যে ৭০ অনুচ্ছেদ কার্যকর থাকবে এবং দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সদস্যপদ বাতিল হবে। তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হলেও এটি সাংবিধানিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচন কমিশনও তাঁর বক্তব্য সমর্থন করে কোনো আইনি সিদ্ধান্ত দেয়নি। বরং ইসি সচিব আখতার আহমেদ বিষয়টিকে ‘রাজনৈতিক প্রশ্ন’ হিসেবে অভিহিত করে মন্তব্য এড়িয়ে গেছেন।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ভাষা সংক্ষিপ্ত। এতে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হওয়ার দুটি ক্ষেত্র উল্লেখ আছে—দল থেকে পদত্যাগ এবং সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান। এখানে একটি বহুল প্রচারিত ভুল সংশোধন জরুরি, কারণ এই অনুচ্ছেদে ‘সংসদে আনীত কোনো প্রস্তাবের ওপর’ কথাটি নেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কোনো বিল বা সাধারণ প্রস্তাব নয়, বরং এটি একটি স্বতন্ত্র সাংবিধানিক নির্বাচন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর ৪ ধারা অনুযায়ী নির্বাচন সংসদ কক্ষে অনুষ্ঠিত হলেও, কক্ষটি ব্যবহৃত হলেই বৈঠকটি সংসদের নিয়মিত অধিবেশন হয়ে যায় না। সংসদ অধিবেশনে না থাকলেও নির্বাচন কমিশন স্পিকারের সঙ্গে পরামর্শ করে এই বৈঠকের আয়োজন করতে পারে, যেখানে স্পিকার সভাপতিত্ব করেন না, বরং প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০ আগস্টের ভোট সংসদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যবর্তী সময়ে একটি পৃথক বৈঠক হিসেবে অনুষ্ঠিত হবে। এই কাঠামোই ৭০ অনুচ্ছেদ অপ্রযোজ্য হওয়ার পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালটের ব্যবস্থাও ছিল, যা থেকে বোঝা যায় সংবিধানপ্রণেতারা দলত্যাগবিরোধী বিধান এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যের গোপন পছন্দকে আলাদাভাবে দেখেছিলেন। ১৯৯১ সালের আইনে প্রকাশ্য ভোট চালু করা হলেও, সাধারণ আইন দিয়ে সংবিধানের শাস্তির ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা যায় না।
তবে বিপরীত ব্যাখ্যাটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ৭০ অনুচ্ছেদে ‘সংসদের কোনো অধিবেশনে’ বা ‘কোনো বিলের ওপর’ কথাটি নেই। যেহেতু ভোটটি সংসদ কক্ষে হয় এবং এটি প্রকাশ্য, তাই দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্দেশ্য থেকে কেউ কেউ মনে করেন এটি প্রযোজ্য হতে পারে। এ বিষয়ে সরাসরি ও বাধ্যতামূলক বিচারিক নজির না থাকায় একটি বাস্তব সাংবিধানিক অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সদস্যপদের অযোগ্যতা ও আসন শূন্য হওয়ার প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়। ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে কোনো আসন শূন্য হবে কি না, তা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হয়। তাই চিফ হুইপের ঘোষণামাত্রই কোনো আসন শূন্য হয়ে যায় না; আগে সাংবিধানিক প্রশ্নটি যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্ধারণ করতে হবে।
রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির দিকটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির ৩১ দফার ৬ নম্বর প্রস্তাবে আস্থাভোট, অর্থবিল, সংবিধান সংশোধনী এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরির কথা ছিল। ২০২৬ সালের নির্বাচনী ইশতেহারের ১১ নম্বর দফায় ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাবেও অর্থবিল ও আস্থাভোটের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু ৭০ অনুচ্ছেদে ব্যতিক্রম যুক্ত করলেই হবে না, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনেও দলীয় নির্দেশ এবং ভোটের গোপনীয়তা স্পষ্ট করতে হবে। রাষ্ট্রপতি পুরো রাষ্ট্রের প্রতীক হওয়ায় তাঁর নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের বিবেকভিত্তিক ও গোপন ভোটের ব্যবস্থা থাকা অধিক যুক্তিসংগত। এই অনিশ্চয়তা দূর করতে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন অথবা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সত্যিকারের স্বাধীন ও গোপন ভোটে ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।





























