জ্বালানি সংকট নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন
- আপডেট সময় : ০৬:৩৭:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬ ৪০ বার পড়া হয়েছে

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার জটিলতা বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে চরম উদ্বেগের কারণ হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে। এই সংকটের প্রভাব কেবল বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর নেতিবাচক অভিঘাত পড়ছে কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর। একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তিই হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, তাই অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে জ্বালানি নিরাপত্তার কোনো বিকল্প নেই।
দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের উৎপাদন কমে আসা, আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে না ওঠায় জ্বালানি খাতের এই সংকট এখন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা, সিএনজি স্টেশন থেকে শুরু করে আবাসিক গ্রাহক পর্যন্ত সবখানেই এর প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। যদিও এই সংকটের দায় অতীতের সরকারগুলোর নীতিগত ব্যর্থতার ওপর বর্তায়, তবে এর সমাধানের দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ওপরই রয়েছে।
বর্তমানে দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গ্যাস ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে চাহিদার সঙ্গে সরবরাহের বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপের কারণে আমদানি ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। একটি এলএনজি টার্মিনাল বিকল হওয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, কেবল এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
সরকারের সামনে এখন দুটি প্রধান কাজ—তাৎক্ষণিকভাবে সরবরাহের ঘাটতি মোকাবিলা করা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমানো। নতুন এফএসআরইউ, ল্যান্ডবেসড এলএনজি টার্মিনাল এবং অতিরিক্ত কার্গো সংগ্রহের উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও এসব অবকাঠামো বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে, তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গ্যাস অনুসন্ধান ও দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো। স্থলভাগের পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সম্ভাবনাময় স্তর আধুনিক প্রযুক্তিতে কাজে লাগানোর পাশাপাশি নতুন কূপ খনন এবং অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আকৃষ্ট করতে প্রতিযোগিতামূলক ও স্বচ্ছ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভোলার গ্যাসসহ সম্ভাবনাময় দেশীয় উৎসগুলোকেও দ্রুত উন্নয়নের আওতায় আনা দরকার।
গ্যাস সংকটের প্রভাব বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে সবচেয়ে বেশি। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে বিপুল বিনিয়োগে গড়ে ওঠা গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে না পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং শিল্পের উৎপাদন কমে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সীমিত গ্যাস কোন খাতে কতটা অগ্রাধিকার পাবে, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত নীতি প্রণয়ন এবং কয়লা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে গ্যাসের ওপর চাপ কমানোর বিকল্প নেই।
অতীতের ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত যেন জনগণ ও অর্থনীতিকে আর দিতে না হয়, সেজন্য সরকারকে স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মনোযোগী হতে হবে। রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের সমন্বয়েই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। এটি কেবল জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার পরীক্ষা। সময়ক্ষেপণ না করে সমন্বিত, বাস্তবভিত্তিক ও টেকসই পদক্ষেপই পারে এই সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে।





























