ঢাকা ১২:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
রোমে বিমানের ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটি, দুই রুটের যাত্রা বিলম্বিত বন্য প্রাণী পাচারে একই ব্যক্তিদের বারবার জড়িত হওয়ার নেপথ্যে মজুতদারির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, ব্যবসায়ীদের হুঁশিয়ারি দিলেন আইনমন্ত্রী নাটোরে বাসের ধাক্কায় গরুবাহী ভটভটি উল্টে নিহত ২ রাজধানীতে ডিএমপির সাঁড়াশি অভিযানে ৪৮৫ জন গ্রেফতার ভারতে যেভাবে দিন কাটাচ্ছেন পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারা আগস্ট মাসে বজ্রঝড় ও বন্যার পূর্বাভাস দিল আবহাওয়া অধিদপ্তর গণভবনের জুলাই স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে দেখলেন নাহিদ ইসলাম ও এনসিপি নেতারা শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি ও ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

বন্য প্রাণী পাচারে একই ব্যক্তিদের বারবার জড়িত হওয়ার নেপথ্যে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:২৪:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি
print news

গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ৯৬টি উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে ৩ হাজার ৬৫০টি বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৯৬টি মামলায় ৬৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩০ জন। ২০টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত রায় হয়েছে মাত্র দুটিতে, যেখানে সাতজন সাজা পেয়েছেন। অধিকাংশ মামলা বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে আটকে আছে।

পাচারকারী এমরান হোসেনের কর্মকাণ্ড এই চক্রের পুনরাবৃত্তির একটি বড় উদাহরণ। ২০২৩ সালের ৯ জুন কলাতলীতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ দুটি বিরল উল্লুক উদ্ধারের চেষ্টা করলে তিনি পালিয়ে যান। একই বছরের ১২ আগস্ট বাকলিয়ায় বাঁশভালুক পাচারের অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন। ৩০ অক্টোবর হগ বেজার উদ্ধারের অভিযানেও তাঁর নাম আসে এবং তিনি পালিয়ে যান। প্রায় দেড় বছর পর ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মাতুয়াইল থেকে ১১টি মুখপোড়া হনুমানসহ তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। বন বিভাগের তদন্তে উঠে এসেছে, এমরান পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে প্রাণী সংগ্রহ করে পাচারকারীদের কাছে সরবরাহ করতেন এবং জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়তেন।

শুধু এমরান নন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে এমন আরও কয়েকজন রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে একাধিকবার বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগ উঠেছে। মো. সাদ্দাম ওরফে জুয়েল ও জগ্লুর বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। গত ৩ মে লালখান বাজার থেকে চশমাপরা হনুমান উদ্ধারের সময় তিনি পালিয়ে যান এবং পরে গত রোববার হাটহাজারী থেকে ১৩টি সবুজ টিয়াসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। হাদিসুর রহমান নামে আরেক পাচারকারী ৮ জুন চকরিয়া থেকে গ্রেপ্তার হন, যার কাছ থেকে একটি মুখপোড়া হনুমান, একটি মৃত বানরের বাচ্চা ও ১২টি পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়। হাদিসুর এর আগেও অন্তত চারবার বন্য প্রাণী পাচারের ঘটনায় ধরা পড়েছিলেন এবং তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা বড় একটি পাচার চক্রের অংশ।

শুধু চট্টগ্রাম নয়, রাজধানী ঢাকাতেও একই চিত্র। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে রাজধানীকেন্দ্রিক ১৪৭টি উদ্ধার অভিযানে ২ হাজার ৮০টি বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ, গন্ধগোকুল, শজারু, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও কচ্ছপ এবং শত শত পাখি। এমনকি শিয়ালের কাটা মাথা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গও উদ্ধার হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, উদ্ধার হওয়া প্রাণী পাচারের প্রকৃত চিত্রের সামান্য অংশমাত্র।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের চট্টগ্রামের বিভাগীয় কর্মকর্তা আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ জানান, বর্তমান আইনে শাস্তির মাত্রা তুলনামূলক কম এবং মামলার বিচার দীর্ঘ হওয়ায় আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যান। হাতি বা বাঘ হত্যার জন্য সাত বছরের শাস্তির বিধান থাকলেও অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ তিন বছর। তিনি জানান, পাচার চক্রের তুলনায় বন বিভাগের জনবল ও সক্ষমতা খুবই সীমিত। সারা দেশে বিভাগীয় কার্যালয় মাত্র চারটি এবং বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটে মাত্র ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। তাঁর মতে, শুধু উদ্ধার অভিযান চালিয়ে নয়, বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমেই এ চক্র ভাঙা সম্ভব।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সুন্দরবনে একসময় বাঘসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী পাচারের ঘটনা ঘটত, যা ধারাবাহিক পদক্ষেপে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বন্য প্রাণী পাচার বন্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী অরিক্স-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, বন্য প্রাণী পাচার এখন বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সংঘবদ্ধ ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক। বিরল প্রাণীর দাম অবৈধ বাজারে ১ থেকে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি হওয়ায় শিকার ও পাচারের লোভ বাড়ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. ফরিদ আহসান মনে করেন, কেবল প্রাণী উদ্ধার বা দু-একজনকে গ্রেপ্তার করে এ অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়; অর্থের জোগানদাতা, সংগ্রাহক, পরিবহনকারী ও বিক্রেতাসহ পুরো নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

বন্য প্রাণী পাচারে একই ব্যক্তিদের বারবার জড়িত হওয়ার নেপথ্যে

আপডেট সময় : ১২:২৪:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
print news

গত পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ৯৬টি উদ্ধার অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে ৩ হাজার ৬৫০টি বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৯৬টি মামলায় ৬৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩০ জন। ২০টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত রায় হয়েছে মাত্র দুটিতে, যেখানে সাতজন সাজা পেয়েছেন। অধিকাংশ মামলা বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে আটকে আছে।

পাচারকারী এমরান হোসেনের কর্মকাণ্ড এই চক্রের পুনরাবৃত্তির একটি বড় উদাহরণ। ২০২৩ সালের ৯ জুন কলাতলীতে অভিযান চালিয়ে পুলিশ দুটি বিরল উল্লুক উদ্ধারের চেষ্টা করলে তিনি পালিয়ে যান। একই বছরের ১২ আগস্ট বাকলিয়ায় বাঁশভালুক পাচারের অভিযোগে তিনি গ্রেপ্তার হন। ৩০ অক্টোবর হগ বেজার উদ্ধারের অভিযানেও তাঁর নাম আসে এবং তিনি পালিয়ে যান। প্রায় দেড় বছর পর ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মাতুয়াইল থেকে ১১টি মুখপোড়া হনুমানসহ তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। বন বিভাগের তদন্তে উঠে এসেছে, এমরান পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে প্রাণী সংগ্রহ করে পাচারকারীদের কাছে সরবরাহ করতেন এবং জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়তেন।

শুধু এমরান নন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে এমন আরও কয়েকজন রয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে একাধিকবার বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগ উঠেছে। মো. সাদ্দাম ওরফে জুয়েল ও জগ্লুর বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। গত ৩ মে লালখান বাজার থেকে চশমাপরা হনুমান উদ্ধারের সময় তিনি পালিয়ে যান এবং পরে গত রোববার হাটহাজারী থেকে ১৩টি সবুজ টিয়াসহ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। হাদিসুর রহমান নামে আরেক পাচারকারী ৮ জুন চকরিয়া থেকে গ্রেপ্তার হন, যার কাছ থেকে একটি মুখপোড়া হনুমান, একটি মৃত বানরের বাচ্চা ও ১২টি পাহাড়ি হলুদ কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়। হাদিসুর এর আগেও অন্তত চারবার বন্য প্রাণী পাচারের ঘটনায় ধরা পড়েছিলেন এবং তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, তাঁরা বড় একটি পাচার চক্রের অংশ।

শুধু চট্টগ্রাম নয়, রাজধানী ঢাকাতেও একই চিত্র। বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে রাজধানীকেন্দ্রিক ১৪৭টি উদ্ধার অভিযানে ২ হাজার ৮০টি বন্য প্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া প্রাণীর মধ্যে রয়েছে চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ, গন্ধগোকুল, শজারু, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও কচ্ছপ এবং শত শত পাখি। এমনকি শিয়ালের কাটা মাথা ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গও উদ্ধার হয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, উদ্ধার হওয়া প্রাণী পাচারের প্রকৃত চিত্রের সামান্য অংশমাত্র।

বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের চট্টগ্রামের বিভাগীয় কর্মকর্তা আবু নাছের মো. ইয়াছিন নেওয়াজ জানান, বর্তমান আইনে শাস্তির মাত্রা তুলনামূলক কম এবং মামলার বিচার দীর্ঘ হওয়ায় আসামিরা সহজেই জামিন পেয়ে যান। হাতি বা বাঘ হত্যার জন্য সাত বছরের শাস্তির বিধান থাকলেও অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ তিন বছর। তিনি জানান, পাচার চক্রের তুলনায় বন বিভাগের জনবল ও সক্ষমতা খুবই সীমিত। সারা দেশে বিভাগীয় কার্যালয় মাত্র চারটি এবং বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটে মাত্র ছয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছেন। তাঁর মতে, শুধু উদ্ধার অভিযান চালিয়ে নয়, বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমেই এ চক্র ভাঙা সম্ভব।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সুন্দরবনে একসময় বাঘসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী পাচারের ঘটনা ঘটত, যা ধারাবাহিক পদক্ষেপে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বন্য প্রাণী পাচার বন্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী অরিক্স-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, বন্য প্রাণী পাচার এখন বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি একটি সংঘবদ্ধ ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক। বিরল প্রাণীর দাম অবৈধ বাজারে ১ থেকে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি হওয়ায় শিকার ও পাচারের লোভ বাড়ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. ফরিদ আহসান মনে করেন, কেবল প্রাণী উদ্ধার বা দু-একজনকে গ্রেপ্তার করে এ অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়; অর্থের জোগানদাতা, সংগ্রাহক, পরিবহনকারী ও বিক্রেতাসহ পুরো নেটওয়ার্ককে আইনের আওতায় আনা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo