রাষ্ট্র রূপান্তরের যুগসন্ধি ও ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য
- আপডেট সময় : ১১:০৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

একটি জাতির ইতিহাস কখনোই বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি নয়; এটি দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, অর্জন এবং আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক অভিযাত্রা। কোনো জাতি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে না। সময়ের প্রবাহে নতুন বাস্তবতা, নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন সংকট এবং নতুন প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়। যে জাতি অতীতের অভিজ্ঞতা ও অর্জনকে শক্তিতে রূপান্তরিত করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই কথা বলে। পক্ষান্তরে, যে জাতি অতীতের গৌরবকে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রেরণা হিসেবে গ্রহণ না করে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত করে, তারা একসময় অগ্রগতির পথ হারিয়ে ফেলে। ইতিহাসের শিক্ষা হলো অতীতকে অস্বীকার করা যেমন আত্মঘাতী, তেমনি অতীতের মধ্যেই বন্দি হয়ে থাকাও সমান ক্ষতিকর।
১৭৫৭ সালের পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় যেমন এ অঞ্চলে একটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করেছিল, তেমনি ১৯৭১ সালের বিজয়ও কোনো চূড়ান্ত সমাপ্তি ছিল না। স্বাধীনতা অর্জনের মাধ্যমে একটি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ পায়; কিন্তু সেই রাষ্ট্রকে কতটা ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন করা যাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার সংগ্রাম তখনই শুরু হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা প্রায়ই বলেন, স্বাধীনতা একটি ঘটনা; কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় কখনো অগ্রগতি আসে, কখনো পশ্চাৎপদতা দেখা দেয়; কখনো জনগণের আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রকে সামনে এগিয়ে নেয়, আবার কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরাচারী ভূমিকায় জালেম শাসকশ্রেণির জাঁতাকলে পিষ্ট মজলুম জনগণ মুক্তির পথ খোঁজে গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লবের পথে।
এ কারণেই স্বাধীনতা কোনো গন্তব্য নয়; এটি রাষ্ট্র হিসেবে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, জনগণের অধিকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ যাত্রার সূচনা মাত্র। বাংলাদেশের ইতিহাসও সেই ধারাবাহিকতার বাইরে নয়। আমাদের জাতীয় ইতিহাসকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি চলমান অভিযাত্রা হিসেবে দেখতে হবে, যেখানে প্রতিটি সংগ্রাম-পূর্ববর্তী সংগ্রামের উত্তরাধিকার বহন করে এবং পরবর্তী সংগ্রামের ভিত্তি নির্মাণ করে। এই ধারাবাহিক ঐতিহাসিক প্রবাহের মধ্যেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য অনুধাবন করতে হবে; একটি প্রতিদ্বন্দ্বী ইতিহাস হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজকে আরো ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও স্বৈরাচারমুক্ত করার দীর্ঘ অভিযাত্রার একটি নতুন অধ্যায় হিসেবে।
বিশ্ব ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই বাস্তবতা দেখতে পাই। ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পথ খুলে দিলেও সেখানে নাগরিক অধিকার, বর্ণসমতা এবং গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নে দীর্ঘ সংগ্রাম অব্যাহত ছিল। একইভাবে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মহান আদর্শ সামনে নিয়ে এলেও গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সুসংহত করতে ফরাসি সমাজকে বহু উত্থান-পতন, সংঘাত ও পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের মাধ্যমে রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের পরও সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে নতুন সংগ্রামের সূচনা হয়েছে। ইতিহাসের এই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের শেখায় যে রাজনৈতিক মুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, কিন্তু সেই অর্জনের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
ইতিহাসের প্রতিটি বিজয় নতুন দায়িত্বের জন্ম দেয়, প্রতিটি অর্জন নতুন প্রত্যাশাকে সামনে নিয়ে আসে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো কারণ নেই। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের যে স্বপ্ন জনগণ লালন করেছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো একটি চলমান প্রক্রিয়া। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা, আকস্মিক বিস্ফোরণ বা সাময়িক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীর্ঘ বিবর্তনধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ও বিশেষ অধ্যায়। এটি এমন এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্রের সামনে জবাবদিহি, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা, ন্যায্য অধিকার এবং নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নগুলো নতুন করে উত্থাপন করেছে।
২০২৪-এর এই গণঅভ্যুত্থান বিশেষভাবে তরুণ প্রজন্মের সেই ঐতিহাসিক ভূমিকাকে সামনে নিয়ে এসেছে, যা যুগে যুগে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন জবাবদিহির পরিসর সংকুচিত করে, যখন নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে এবং যখন ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন পরিবর্তনের দাবি সবচেয়ে জোরালোভাবে উচ্চারিত হয় তরুণদের কণ্ঠে। জুলাই আন্দোলন কোনো একক রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা সংগঠনের একচ্ছত্র উদ্যোগ ছিল না। এর প্রাণশক্তি ছিল সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। ফলে জুলাইয়ের ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ‘প্রতীকী পুঁজি’ হিসেবে দীর্ঘ মেয়াদে একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করার সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে গেছে।
আমাদের স্বীকার করতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুটি মৌলিক দাবি—একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্রযন্ত্র এবং একটি স্বৈরাচারমুক্ত শাসনব্যবস্থা। এই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবেই ‘জুলাই সনদ’-এর ধারণা সামনে আসে, যার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, নাগরিক অধিকার সুরক্ষা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি নির্মাণ করা। তবে এসব সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতার মধ্যেও জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি বাংলাদেশের জনগণকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতির একক ব্যাখ্যা নয়; বরং জনগণের অব্যাহত সম্মতি, অংশগ্রহণ এবং আস্থার ওপরই রাষ্ট্রযন্ত্রের শক্তি নির্ভর করে।
চব্বিশের জুলাইয়ের প্রকৃত ঐতিহাসিক সাফল্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার ব্যবহার পদ্ধতির বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে প্রকৃত রূপান্তর শুধু শাসকের পরিবর্তনে আসে না; আসে জনগণের রাজনৈতিক চেতনার পরিবর্তনের মাধ্যমে। জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি সাধারণ মানুষকে আবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে রাষ্ট্র কোনো শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; রাষ্ট্র জনগণের এবং জনগণই তার প্রকৃত মালিক। এটি নাগরিকদের মধ্যে সেই আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে যে অন্যায়, বৈষম্য এবং জবাবদিহিহীনতার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাদের রয়েছে।





























