আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োগ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী অবস্থান
- আপডেট সময় : ০৩:১৬:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬ ২৩ বার পড়া হয়েছে

২০২৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাতিমির পুতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের অবস্থানের বিপরীতে একটি বড় পরিবর্তন। কারণ, ওয়াশিংটন ঐতিহাসিকভাবে দাবি করে এসেছে যে, রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করেনি এমন দেশের নাগরিকদের ওপর আইসিসির কোনো এখতিয়ার নেই; যে তালিকায় রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
তবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাইডেন তার এই অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনেন। যখন আইসিসি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে, তখন বাইডেন এই সিদ্ধান্তকে অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র ইসরায়েলের পাশে থাকবে। উল্লেখ্য, ইসরায়েলও রোম সংবিধির স্বাক্ষরকারী দেশ নয়।
পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে এই নীতিকে আরও কঠোর করেন। তিনি আইসিসির কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং তাদের সম্পদ জব্দ করার নির্দেশ দেন। ২০২৫ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই আদালতকে আইনের অপব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে অভিহিত করেন। একই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আইসিসির ১১ জন বিচারক ও প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর আদালতটিকে দুর্বল করার লক্ষ্যে একটি প্রচারণা শুরু করে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে এমন এক দ্বিমুখী আচরণ করছে যেখানে শত্রুর বিরুদ্ধে আইসিসিকে সঠিক মনে করা হলেও মিত্রদের ক্ষেত্রে তা মানতে নারাজ। অথচ রোম সংবিধির মূল নীতি হলো পরিপূরকতা, যার অর্থ কোনো দেশ যখন নিজ থেকে যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়, তখনই আইসিসি কার্যকর হয়। ইসরায়েলের দাবি যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নয়, তাই আদালতের এখতিয়ার নেই—এই যুক্তিটি প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করার একটি কৌশল মাত্র।
আইসিসির নিজস্ব পুলিশ বাহিনী নেই, ফলে তাদের ক্ষমতা কাউকে সরাসরি গ্রেপ্তার করার চেয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক চলাফেরা কঠিন করে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। উদাহরণস্বরূপ, পুতিন রোম সংবিধি স্বাক্ষরকারী ১২৫টি দেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে গ্রেপ্তারের ঝুঁকির মুখে রয়েছেন, যার ফলে তিনি ২০২৩ সালের ব্রিকস সম্মেলনে সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি। একইভাবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তাকে বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
নিরাপত্তা পরিষদের মতো আইসিসির সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিতে পারে না। দেশটির সামনে এখন দুটি পথ খোলা—হয় এই ব্যবস্থার ভেতরে থেকে প্রভাব বিস্তার করা, নয়তো এটি বর্জন করে নিজের প্রভাব কমিয়ে ফেলা। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় পথটিই বেছে নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং বিশ্বকে বিভিন্ন শক্তির বলয়ে বিভক্ত করছে।





























