আঙুলের ছাপের অনন্যতা: যেভাবে গর্ভেই তৈরি হয় এই অদ্বিতীয় জ্যামিতিক নকশা
- আপডেট সময় : ০৭:৪৪:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

মানুষের আঙুলের ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট সম্পূর্ণ অনন্য ও অদ্বিতীয়। এই মহাবিশ্বে একজনের আঙুলের ছাপের জ্যামিতিক নকশার সঙ্গে অন্য কারও নকশার কোনো মিল নেই। এমনকি যেসব আইডেনটিক্যাল জমজ (Identical Twins) সন্তানের ডিএনএ প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ একই রকম থাকে, তাদের আঙুলের ছাপও কখনো এক হয় না। মূলত মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় শিশুর আঙুলের এই বিশেষ নকশা গঠিত হতে শুরু করে। গর্ভধারণের ১০ম থেকে ১৩তম সপ্তাহের মধ্যে আঙুলের ত্বকে প্রাথমিক রেখাগুলো তৈরি হয় এবং ১৬তম থেকে ১৯তম সপ্তাহের মধ্যে তা স্থায়ী রূপ নেয়।
গর্ভাশয়ের ভেতরের অ্যামনিওটিক তরলের প্রবাহ ও চাপ, রক্তনালীর বিন্যাস এবং ভ্রূণের নড়াচড়ার মতো নানা পরিবর্তনশীল জৈবিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই জ্যামিতিক নকশাটি গড়ে ওঠে। এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াগুলো এতই ভিন্ন ও বৈচিত্র্যময় হয় যে, একই গর্ভে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা আইডেনটিক্যাল জমজ সন্তানের আঙুলের ছাপেও সম্পূর্ণ আলাদা জ্যামিতিক রূপ তৈরি হয়। একবার গর্ভে এই জ্যামিতিক নকশা তৈরি হয়ে গেলে মানুষের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এটি আর কখনো পরিবর্তিত হয় না। যদি কখনো আঙুলের উপরিভাগ বা এপিডার্মিস কেটে বা পুড়েও যায়, তবে তা সুস্থ হওয়ার পর ঠিক আগের নকশাতেই ফিরে আসে। কেবল আঘাত যদি ত্বকের গভীরের ডার্মাল প্যাপিলা স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়, তবেই কেবল স্থায়ী ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা আবার নিজের জায়গায় আরেকটি অনন্য চিহ্ন বহন করে。
আঙুলের ছাপের এই অনন্যতা আবিষ্কার ও তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণের পেছনে রয়েছে কয়েকজন গবেষকের ঐতিহাসিক অবদান। ১৮৮০ সালে স্কটিশ চিকিৎসক স্যার হেনরি ফোল্ডস প্রথম বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার'-এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে আঙুলের ছাপ দিয়ে অপরাধী ও ব্যক্তি শনাক্তকরণের বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। পরবর্তীতে ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার ফ্রান্সিস গাল্টন এ বিষয়ে গভীর গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করেন। তিনি 'গাল্টন ডিটেইলস' তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, দুটি ভিন্ন মানুষের আঙুলের ছাপ হুবহু এক হওয়ার সম্ভাবনা গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্ভব।
পরবর্তীতে ১৮৯৭ সালে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে এই আবিষ্কারকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দেওয়ার জন্য এক যুগান্তকারী গাণিতিক শ্রেণীবদ্ধকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন দুই বাঙালি মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তা কাজী আজিজুল হক এবং হেমচন্দ্র বসু। তাদের তৈরি করা এই গাণিতিক ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করেই বিখ্যাত 'হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম' গড়ে ওঠে, যা বিশ্বজুড়ে আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।
জ্যামিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আঙুলের ছাপে প্রধানত তিনটি মূল নকশা দেখা যায়—লুপ বা বাঁকানো রেখা, আর্চ বা ধনুকের মতো খিলান এবং ওয়ার্ল বা পেঁচানো ঘূর্ণি। আমাদের আঙুলের ত্বকে থাকা রেখাগুলো যেখানে দ্বিখণ্ডিত হয়, শেষ হয়ে যায় এবং বিন্দুর মতো রূপ নেয়, সেই সূক্ষ্ম স্থানগুলোকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় 'মিনুশাই' বলা হয়। একটি আঙুলে এমন ৫০ থেকে ১৫০টি মিনুশাই পয়েন্ট থাকে। এই বিন্দুগুলোর অবস্থান, কোণ ও পারস্পরিক দূরত্বের যে জটিল জ্যামিতিক হিসাব তৈরি হয়, তা প্রতিটি মানুষের জন্য আলাদা। এই বিন্দুর সমন্বয়ে যে সম্ভাবনার বিন্যাস (Permutation) তৈরি হয়, তা গাণিতিকভাবে অসম্ভব এক সংখ্যা নির্দেশ করে। এই অপরিবর্তনশীল ও নিখুঁত জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যন্ত সব জায়গায় আঙুলের ছাপকে মানুষের সবচেয়ে সত্য ও নির্ভুল পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
লেখক : মইনুল রনি, * তথ্যসূত্র : Discover with Mainul





























