একাত্তরের ভূমিকা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছে জামায়াত: আইনমন্ত্রী
- আপডেট সময় : ০৩:০৯:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

একাত্তরের অপরাধের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা না চাইলেও পরোক্ষভাবে সেই সময়ের নিজেদের অবস্থান ও ভূমিকা জামায়াতে ইসলামী মেনে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের লেখা একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। দলটির সাবেক এই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল তাঁর বইয়ে ১৯৭১ সালের কর্মকাণ্ডের জন্য জামায়াতকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন, যার সূত্র ধরে আইনমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ইসলামি শাসন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা একটি ভ্রান্ত নীতি বা ফ্যালাসি। সমাজ থেকে ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে রাষ্ট্র গঠন ও পরিচালনা করাই প্রকৃত ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ। ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ে বিষয়টি এভাবেই এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, লেখকের এই চিন্তার সঙ্গে দ্বিমত থাকতে পারে, তবে মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার জায়গা থেকে এটি আইনবিদদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বইটিকে কোনো সাধারণ সাহিত্য বা কেবল গবেষণাধর্মী কাজ না বলে, একজন মানুষের জীবন দর্শনের জীবন্ত বিশ্বকোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো মনে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্বের অনুপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট বা আইন অঙ্গনে পরিচিত জামায়াতের মূল ধারার আইনজীবী ও নেতারা আজকের আলোচনায় উপস্থিত থাকবেন বলে তাঁর প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তাদের অনুপস্থিতি তাদের দীনতা, ব্যর্থতা, সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ। আসাদুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে দ্বিমত পোষণ করার অধিকার সবারই আছে। রাজ্জাক সাহেবের সব কথার সঙ্গে একমত না হলেও তাঁর সমালোচনা গ্রহণ করতে না পারাটা সঠিক নয়। এই বইয়ে বিএনপিরও সমালোচনা করা হয়েছে এবং তা সবাইকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
আইনমন্ত্রী একাত্তরের প্রসঙ্গে জামায়াতের অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইনের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি জানান, ২০২২ সালের এই আইনে মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, রাজাকার, আল বদর, জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামীর বিরোধিতা করে স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সংশোধনী ও ২০২৬ সালে এটিকে সংসদীয় আইনে পরিণত করার প্রক্রিয়ায় বিশেষ কমিটিতে জামায়াতের পক্ষ থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি তোলা হয়। তবে ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করা সম্ভব নয় জানিয়ে আলোচনার পর আইনে শুধু 'তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী', 'তৎকালীন মুসলিম লীগ' ও 'তৎকালীন নেজামে ইসলাম' শব্দগুলো যুক্ত করা হয়।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, পরবর্তীতে যখন বিলটি সংসদে পাস করার জন্য তোলা হয়, তখন জামায়াতে ইসলামীর কোনো সদস্য এর বিপক্ষে অর্থাৎ 'না' ভোট দেননি। এটি রেকর্ডভুক্ত রয়েছে। আসাদুজ্জামান উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার রাজ্জাক যে রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকাকে জাতির সামনে আনার জন্য একটি বিবৃতি তৈরি করেছিলেন, জামায়াত যদি তখন তাতে স্বাক্ষর করত, তবে দলটিকে নিয়ে অনেক প্রশ্নের সমাধান হতো। বর্তমানে জামায়াত সেই অবস্থানই মেনে নিয়েছে। সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে 'না' ভোট না দেওয়ার মাধ্যমে জামায়াত পরোক্ষভাবে একাত্তরের সেই ভূমিকাকেই মেনে নিয়েছে এবং এখানেই রাজ্জাক সাহেবের দূরদর্শিতার প্রমাণ মেলে।
can ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) প্রকাশিত এই বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট হিসেবে আরও বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ, ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক Right to Freedom-এর প্রেসিডেন্ট ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এবং দ্য ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর ও বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক রচিত বইটি প্রকাশ করেছে University Press Limited।





























