বাঙালির আভিজাত্যে কাঁসার তৈজসপত্র: চেনার উপায় ও যত্ন
- আপডেট সময় : ১১:৫২:১৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ৯ বার পড়া হয়েছে

বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য ও আভিজাত্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো কাঁসার তৈজসপত্র। আধুনিকতার ভিড়ে এর ব্যবহার কিছুটা কমলেও এর আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। খাঁটি কাঁসার কথা উঠলেই সবার আগে মনে পড়ে ঢাকার অদূরে অবস্থিত ধামরাইয়ের কথা। ধামরাইয়ের কাঁসা-পিতলের কারিগরদের নিপুণ হাতের কাজের সুখ্যাতি বিশ্বজোড়া। তবে শুধু ধামরাই নয়; রাজধানীর শাঁখারিবাজার ও তাঁতীবাজার, টাঙ্গাইলের কাগমারী, জামালপুরের ইসলামপুর এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটেও ঐতিহ্যবাহী ও খাঁটি কাঁসার পণ্য পাওয়া যায়। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিয়ের তত্ত্ব সাজানো কিংবা পূজার সামগ্রী কেনার জন্য শাঁখারিবাজারের শত বছরের পুরোনো দোকানগুলো আজও ক্রেতাদের কাছে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য।
বাজারে কাঁসার জিনিসপত্র সাধারণত পিস হিসেবে নয়, বরং ওজনে বিক্রি হয়। বর্তমান বাজারে মান ও কারুকাজের ওপর ভিত্তি করে প্রতি কেজি খাঁটি কাঁসার মূল্য ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। দৈনন্দিন ব্যবহৃত সাধারণ ওজনের একটি কাঁসার গ্লাসের দাম ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা, মাঝারি থালার দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা, বাটি ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা, চামচ ২০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং বড় জগ বা লোটা ২ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। এছাড়া পূজার উপকরণের মধ্যে পঞ্চপ্রদীপ ৫০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, ঘণ্টা ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকা, কোশা-কুশি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, ধূপদানি ৬০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং নকশাদার বিশেষ পূজার থালি ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। কারুকাজ বা সূক্ষ্ম নকশার ওপর ভিত্তি করে দাম আরও বাড়তে পারে।
বাতাসের অক্সিজেনের সংস্পর্শে এসে কাঁসার পাত্রে কালচে ছোপ পড়া স্বাভাবিক। এটি দূর করতে তেঁতুলগোলা জল কিংবা পাতিলেবুর রসের সঙ্গে সামান্য লবণ বা বেকিং সোডা মিশিয়ে মাজলে পাত্র নতুনের মতো চকচকে হয়। বাজারে ‘পীতাম্বরী’ বা ‘রূপম’ নামের বিশেষ পাউডারও পাওয়া যায়। ধোয়ার পর সুতির শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে রাখলে পানির দাগ পড়ে না। এছাড়া দীর্ঘদিন অযত্নে থাকা পাত্রের জেদি দাগ দূর করতে পেশাদার পলিশিং বা ‘জাঁত দেওয়া’ প্রয়োজন। শাঁখারিবাজার, তাঁতীবাজার বা স্থানীয় স্বর্ণকারের দোকানগুলোতে মাঝারি থালা বা বাটি প্রতি ১০০ থেকে ২৫০ টাকা এবং প্রতি কেজি কাঁসা ২০০ থেকে ৪০০ টাকা খরচে পলিশ করা যায়।
কাঁসার পাত্রের ব্যবহার কেবল আধ্যাত্মিক প্রশান্তিই দেয় না, এর স্বাস্থ্যগুণও রয়েছে। সনাতন ধর্মে একে পবিত্র ধাতু হিসেবে গণ্য করা হয়। আয়ুর্বেদশাস্ত্র মতে, কাঁসার পাত্রে খাবার খেলে বা জল পান করলে শরীরে ক্ষারীয় ভারসাম্য বজায় থাকে, হজমশক্তি বাড়ে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কেনার সময় নকল বা পিতলের ওপর প্রলেপ দেওয়া পণ্য থেকে সাবধান থাকতে হবে। খাঁটি কাঁসা চেনার উপায় হলো এর শব্দ; টোকা দিলে এতে দীর্ঘক্ষণ ‘টং’ জাতীয় তীক্ষ্ণ ও মিষ্টি শব্দ হয়। এছাড়া খাঁটি কাঁসার রঙ কালচে সোনালি বা ছাই-সোনালি হয়; এটি কখনোই অতিরিক্ত চকচকে হলুদ বর্ণের হয় না।


























