ঢাকা ০৮:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সাংবাদিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক: প্রেস কাউন্সিল ঢাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে একদিনে গ্রেপ্তার ৪৬৫, মামলা ৭৩ কয়রার যোগাযোগ সংকট কাটাতে ৬০ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়নের উদ্যোগ দেশে ২ কোটি শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা, লক্ষ্য আরও ৩৫ লাখ সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থানে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি ভাঙ্গুড়ায় নৈশ প্রহরী পদে চাকরি দেওয়ার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ সিসিটিভিতে ধরা পড়ল প্রিজন ভ্যান থেকে পিচ্চি রাজার পালানোর দৃশ্য বাংলাদেশ সফরে আসছেন জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শহীদ মনোযোগের রাশ কার হাতে, আপনার নাকি ফোনের স্ক্রিনের? যুক্তরাষ্ট্রে ফায়ারিং স্কোয়াডে কার্যকর হবে সাবেক মেজরের মৃত্যুদণ্ড

নজিরবিহীন ছাত্রবিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, আটক ৫ সহস্রাধিক

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০৫:৫১:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছাত্রবিক্ষোভের মুখোমুখি হয়েছে ফ্রান্স। প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি উচ্চবিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির সরকার। ইতিমধ্যে এই বিক্ষোভের জেরে শত শত স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং অতীতে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই।

বিক্ষোভে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্যরা আহত হয়েছেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লঁসে বিক্ষোভের সময় একটি গ্রেনেড কুড়িয়ে নিতে গিয়ে বিস্ফোরণে এক শিক্ষার্থীর হাত উড়ে গেছে। এছাড়া তুর শহরে আরেক শিক্ষার্থী চোখ হারিয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। আলঁসোঁ শহরে এক পুলিশ সদস্য কর্তৃক এক কিশোরীর গলায় 'হেডলক' দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেশটির আইনে বর্তমানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠের সাঁ-এক্সুপেরি উচ্চবিদ্যালয়ে। শিক্ষকের অভাব এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের দাবিতে শিক্ষকরা ধর্মঘটে গেলে শিক্ষার্থীরাও তাদের সমর্থনে যোগ দেয়। পরবর্তীতে সরকার অতিরিক্ত শিক্ষক পাঠিয়ে সেই ধর্মঘট মেটালেও ততক্ষণে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। শিক্ষার্থী নেতা মানেস নাদেলের মতে, দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন নজিরবিহীন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় এটি সামলাতে পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছে। উত্তর অঞ্চলের লিল থেকে শুরু করে দক্ষিণের মার্সেই পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড দিয়ে স্কুলগুলোর প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়া এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় শতাধিক উচ্চবিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধুমাত্র বৃহত্তর প্যারিস অঞ্চলেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০ লাখ ইউরো।

এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে দেশটির ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের স্কুলগুলো অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট এবং সরঞ্জামের অভাবে ভুগছে। ২০১০ সালে জন্মহার বৃদ্ধির কারণে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ বাড়লেও, ২০০৮ সালের তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা কমে গেছে। বর্তমানে দেশটির সরকারি স্কুলগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রেণিকক্ষেই ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। উপরন্তু, মূল্যস্ফীতির কারণে শিক্ষা খাতে প্রকৃত বাজেট বরাদ্দও কমেছে। অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত চেয়ার-ডেস্ক থাকে না এবং কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প শিক্ষকের অভাবে ক্লাস বাতিল করতে হয়।

সরকার শুরুতে এই বিক্ষোভকে অবমূল্যায়ন করে বামপন্থি দল এলএফআই (LFI)-এর সংশ্লিষ্টতাকে দায়ী করে। জ্যঁ-লুক মেলঁশঁর নেতৃত্বাধীন এই দলটি অবশ্য শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের অধিকারকে সমর্থন করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রথমে কঠোর পুলিশি দমন-পীড়ন চালায় এবং এক দিনেই প্রায় ২ হাজার মানুষকে হেফাজতে নেওয়া হয়। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টিকে ছাত্রবিক্ষোভের চেয়ে 'শহুরে সহিংসতা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে তীব্র চাপের মুখে সরকার ২০২৭ সাল থেকে প্রযুক্তিগত উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর প্রস্তাবিত কিছু ফি আরোপের পরিকল্পনা বাজেট থেকে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে।

সংকটের সমাধানে গত শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষার্থী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। বৈঠক শেষে শিক্ষার্থী নেতারা আগামী মঙ্গলবার আরও বড় বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। শিক্ষার্থী নেতা মানেস নাদেল সরকারের প্রতিক্রিয়াকে 'দায়িত্বজ্ঞানহীন' আখ্যা দিয়ে বলেন, সরকার কেবল দমনের পথ বেছে নিচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের কথা শুনছে না। ফ্রান্সে ১৯৬৮ সালের মে মাসের ঐতিহাসিক ছাত্রবিক্ষোভের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি, যা তৎকালীন সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মঘটে রূপ নিয়েছিল। তবে বর্তমান শিক্ষার্থীরা বলছেন, ১৯৬৮ সালের মতো তারা 'অসম্ভব কিছু' দাবি করছেন না, বরং শিক্ষার জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার অতি সাধারণ দাবি জানাচ্ছেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin

নিউজটি শেয়ার করুন

নজিরবিহীন ছাত্রবিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, আটক ৫ সহস্রাধিক

আপডেট সময় : ০৫:৫১:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছাত্রবিক্ষোভের মুখোমুখি হয়েছে ফ্রান্স। প্যারিসের উপকণ্ঠের একটি উচ্চবিদ্যালয় থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির সরকার। ইতিমধ্যে এই বিক্ষোভের জেরে শত শত স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে এবং ৫ হাজারের বেশি মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং অতীতে কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই।

বিক্ষোভে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্যরা আহত হয়েছেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লঁসে বিক্ষোভের সময় একটি গ্রেনেড কুড়িয়ে নিতে গিয়ে বিস্ফোরণে এক শিক্ষার্থীর হাত উড়ে গেছে। এছাড়া তুর শহরে আরেক শিক্ষার্থী চোখ হারিয়েছেন। বিভিন্ন স্থানে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। আলঁসোঁ শহরে এক পুলিশ সদস্য কর্তৃক এক কিশোরীর গলায় 'হেডলক' দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেশটির আইনে বর্তমানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠের সাঁ-এক্সুপেরি উচ্চবিদ্যালয়ে। শিক্ষকের অভাব এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের দাবিতে শিক্ষকরা ধর্মঘটে গেলে শিক্ষার্থীরাও তাদের সমর্থনে যোগ দেয়। পরবর্তীতে সরকার অতিরিক্ত শিক্ষক পাঠিয়ে সেই ধর্মঘট মেটালেও ততক্ষণে বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। শিক্ষার্থী নেতা মানেস নাদেলের মতে, দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়া এই আন্দোলন নজিরবিহীন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় এটি সামলাতে পুরোপুরি হিমশিম খাচ্ছে। উত্তর অঞ্চলের লিল থেকে শুরু করে দক্ষিণের মার্সেই পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা ব্যারিকেড দিয়ে স্কুলগুলোর প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়। আবর্জনার পাত্রে আগুন দেওয়া এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় শতাধিক উচ্চবিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধুমাত্র বৃহত্তর প্যারিস অঞ্চলেই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০ লাখ ইউরো।

এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে দেশটির ভঙ্গুর শিক্ষা ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের স্কুলগুলো অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক সংকট এবং সরঞ্জামের অভাবে ভুগছে। ২০১০ সালে জন্মহার বৃদ্ধির কারণে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ বাড়লেও, ২০০৮ সালের তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা কমে গেছে। বর্তমানে দেশটির সরকারি স্কুলগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশ শ্রেণিকক্ষেই ৩০ জনের বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। উপরন্তু, মূল্যস্ফীতির কারণে শিক্ষা খাতে প্রকৃত বাজেট বরাদ্দও কমেছে। অনেক সময় শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত চেয়ার-ডেস্ক থাকে না এবং কোনো শিক্ষক অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প শিক্ষকের অভাবে ক্লাস বাতিল করতে হয়।

সরকার শুরুতে এই বিক্ষোভকে অবমূল্যায়ন করে বামপন্থি দল এলএফআই (LFI)-এর সংশ্লিষ্টতাকে দায়ী করে। জ্যঁ-লুক মেলঁশঁর নেতৃত্বাধীন এই দলটি অবশ্য শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের অধিকারকে সমর্থন করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার প্রথমে কঠোর পুলিশি দমন-পীড়ন চালায় এবং এক দিনেই প্রায় ২ হাজার মানুষকে হেফাজতে নেওয়া হয়। সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টিকে ছাত্রবিক্ষোভের চেয়ে 'শহুরে সহিংসতা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তবে তীব্র চাপের মুখে সরকার ২০২৭ সাল থেকে প্রযুক্তিগত উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর প্রস্তাবিত কিছু ফি আরোপের পরিকল্পনা বাজেট থেকে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছে।

সংকটের সমাধানে গত শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে শিক্ষার্থী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। বৈঠক শেষে শিক্ষার্থী নেতারা আগামী মঙ্গলবার আরও বড় বিক্ষোভের ডাক দিয়েছেন। শিক্ষার্থী নেতা মানেস নাদেল সরকারের প্রতিক্রিয়াকে 'দায়িত্বজ্ঞানহীন' আখ্যা দিয়ে বলেন, সরকার কেবল দমনের পথ বেছে নিচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের কথা শুনছে না। ফ্রান্সে ১৯৬৮ সালের মে মাসের ঐতিহাসিক ছাত্রবিক্ষোভের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি, যা তৎকালীন সময়ে দেশের সবচেয়ে বড় ধর্মঘটে রূপ নিয়েছিল। তবে বর্তমান শিক্ষার্থীরা বলছেন, ১৯৬৮ সালের মতো তারা 'অসম্ভব কিছু' দাবি করছেন না, বরং শিক্ষার জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার অতি সাধারণ দাবি জানাচ্ছেন।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin