দেশে বাড়ছে ধর্ষণ মামলা, তদন্তে মিলছে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা
- আপডেট সময় : ০৬:০৪:৪৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

দেশজুড়ে ধর্ষণের ঘটনা ও মামলার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিভিন্ন থানায় মোট ৪,৬৫৪টি ধর্ষণ মামলা রেকর্ড করা হয়েছে, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ৩,২৫২টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ১,৯৪০টি এবং জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ১,৩১২টি মামলা রেকর্ড করা হয়। এছাড়া জুলাই মাসে ৭০৭টি এবং আগস্ট মাসে ৬৯৫টি মামলা হয়েছে। গত বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ১,৫২৮টি মামলা হয়েছিল, অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের একই সময়ে মামলার সংখ্যা ৬২৮টি বেশি। সামগ্রিকভাবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছর মামলার সংখ্যা ৪১২টি বৃদ্ধি পেয়েছে। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ধর্ষণ মামলা হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানায়। এছাড়া চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৬৪টি, গোপালগঞ্জে ৬২, কক্সবাজারে ৬২, ঢাকা জেলায় ৫৮, টাঙ্গাইলে ৫৭, কুমিল্লায় ৫৩, চট্টগ্রাম জেলায় ৫০ এবং বগুড়ায় ৪৭টি মামলা রেকর্ড হয়েছে।
তদন্তে অধিকাংশ ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কর্মীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাওয়ায় পুলিশের উচ্চপর্যায়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম পুলিশের সব ইউনিটকে এসব মামলা নিবিড়ভাবে তদন্ত করে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপারদের তথ্যমতে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় এসব অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে যশোর, হবিগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, নওগাঁ ও পটুয়াখালীতে স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, বিএনপি ও জামায়াতের স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ৪ আগস্ট যশোরের চৌগাছা সরকারি কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরাফাত হোসেন, ৩ জুন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে ছাত্রদল নেতা হোসাইন আহমদ এবং ৯ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা ইসমাইলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পৌর বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বকুলসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা, ১৬ মার্চ বিএনপি নেতা শক্র মাঝিকে গ্রেপ্তার এবং নওগাঁর বদলগাছীতে জামায়াত নেতা শফিউল হাসান ও পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে জামায়াত নেতা মোস্তাফিজুর রহমান মাহবুবের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহ্মদ দাবি করেছেন যে, সরকার কোনো ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করছে না। তার মতে, আগে ভুক্তভোগীরা সামাজিক ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ভয়ে থানায় আসতে পারতেন না, এখন নির্বিঘ্নে অভিযোগ জানানোয় মামলার সংখ্যা পরিসংখ্যানগতভাবে বেড়েছে। তিনি জানান, অপরাধীদের দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে পল্লবীতে শিশু হত্যার বিচার ১৫-১৭ দিনের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। পুলিশের মুখপাত্র এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, পুলিশ ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে এবং দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলোচিত ঘটনার মধ্যে রয়েছে ১৯ মে পল্লবীতে শিশু রামিসা (৭) ধর্ষণ ও হত্যা, ২১ মে চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় চার বছরের শিশু ফারিয়া ধর্ষণ, ৯ সেপ্টেম্বর পাবনায় চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যা এবং ২৭ ফেব্রুয়ারি পাবনার ঈশ্বরদীতে মাদরাসাছাত্রী জামিলা খাতুনকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা। ২৪ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুরে দুই সন্তানের জননীকে ধর্ষণের পর ওই নারী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
অপরাধ বিশ্লেষক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুকের মতে, রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকা দুর্বৃত্তদের বেপরোয়া মনোভাব এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নমনীয়তা ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। এছাড়া প্রযুক্তির অপশিক্ষা, সামাজিক অস্থিরতা এবং সম্পত্তিগত শত্রুতার কারণেও অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। তিনি জানান, ধর্ষকদের বয়স সাধারণত ২৫-৪৫ বছরের মধ্যে বেশি। তিনি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।





























