নয়াদিল্লির ছায়া কাটিয়ে বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির পথে বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ০৩:১৩:৪৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

বিগত ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ধারাটি ছিল মূলত নয়াদিল্লিমুখী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং পরবর্তী বিভিন্ন সরকার, বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দীর্ঘ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুই দেশের মধ্যে আমলাতান্ত্রিক, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের যে গভীরতা তৈরি হয়েছিল, তা একসময় সাধারণ মানুষের কাছে নির্ভরতার প্রতীকে পরিণত হয়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সেই বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ঢাকা এখন ভারতের বাইরে অন্যান্য অংশীদারের দিকেও নজর দিচ্ছে।
এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে একসময় প্রায় অনুচ্চারিত প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গেও আলোচনার টেবিল নতুন করে সাজানো হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে পাকিস্তানের তৎকালীন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জা ঢাকা সফর করেন এবং মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। এতে বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও পাকিস্তানের হাইকমিশনার উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ২০২৬ সালের শুরুতে করাচি ও ঢাকার মধ্যে সরাসরি নৌ ও বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু হয়, যা ১৪ বছরের স্থবিরতা ভেঙেছে। পাকিস্তান বাংলাদেশকে চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্যের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে করাচি বন্দর ব্যবহারের প্রস্তাবও দিয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলেও এই বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি অব্যাহত রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, নীতিটি কেবল অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল না। ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলো যেভাবে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে, বাংলাদেশও এখন সেই পথেই হাঁটছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভারত-নির্ভরতা ছিন্ন করার প্রয়োজন নেই, বরং এটি ঢাকার সামনে নতুন একটি দরজা খুলে দিয়েছে।
অবশ্য ইসলামাবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার বিষয়ে বিভিন্ন মহল থেকে সতর্কবার্তা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও ক্ষত এবং চীন-ভারত প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে পড়ার আশঙ্কাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তবে পররাষ্ট্রনীতিতে সব সম্পর্কেরই ঝুঁকি থাকে, যা বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ভারতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মাধ্যমে বহন করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, কোনো একক শক্তির ছায়ায় না থেকে কীভাবে সবার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা যায়। তুরস্ক, চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গেও সম্পর্কের গুরুত্ব বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে এই ভারসাম্য বজায় রাখবে কি না, তা নির্ভর করছে জনগণ ও নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।




























