জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কায়রোর আল-আজহার শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ও নীরব লড়াই
- আপডেট সময় : ১২:২০:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিনশ্বর অধ্যায় হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। ৫ জুন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণার পর শুরু হওয়া কোটা সংস্কার ও অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটে ৫ আগস্ট। এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম কেবল দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা স্পর্শ করেছিল সুদূর মিশরের কায়রোতে অবস্থিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদেরও। দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে তারা বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদের সুর তুলেছিলেন।
এই আন্দোলনের বৈশ্বিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। যখন দেশের রাজপথে ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত ঢেলে দিচ্ছিল, তখন প্রবাসী সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, গবেষক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও কমিউনিটি নেতারা একটি জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। একই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে প্রবাসী শিক্ষার্থীরাও প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। তবে কায়রোর সেই প্রতিবাদের পেছনে লুকিয়ে ছিল এক গভীর মানসিক ও আবেগীয় যন্ত্রণা। দেশে যখন ইন্টারনেট বন্ধের নিষ্ঠুর অন্ধকার নেমে আসত, তখন নীলনদের তীরের ক্লাসরুমে বসে থাকা এই শিক্ষার্থীদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটত চরম উৎকণ্ঠায়। পরিবার ও দেশের কোনো খবর না পেয়ে তাদের দিন ও রাতগুলো হয়ে উঠত দীর্ঘ ও দুঃসহ।
পরবর্তীতে যখন নেটওয়ার্ক সচল হতো, তখন অনেকের কাছেই আসত আপনজনদের মৃত্যুর ভয়ংকর খবর। কোনো কোনো শিক্ষার্থী জানতে পেরেছিলেন তার ভাইয়ের বা বোনের মৃত্যুর সংবাদ। এই কঠিন সময়ে তারা তাহাজ্জুদের সিজদায় অশ্রু বিসর্জন দিয়ে এবং একের পর এক কুরআন খতম করে দেশের জন্য নিঃশব্দে প্রার্থনা করে গেছেন। বিদেশের মাটিতে বসে ভেজা জায়নামাজ আর রাতের নির্জনতায় উচ্চারিত ফিসফিসে ফরিয়াদের মাধ্যমে যেন তারা লড়েছিলেন এক নীরব যুদ্ধ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে মানববন্ধন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং দূতাবাসের সামনে সংগঠিত প্রতিবাদের মাধ্যমে এই প্রবাসী শিক্ষার্থীরা বিশ্বজুড়ে একটি জোরালো চাপ তৈরি করতে সক্ষম হন। অবশেষে ৫ আগস্ট যখন বাংলাদেশে ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটে, তখন কায়রোর প্রবাসী শিক্ষার্থীদের মাঝে আনন্দের ঢল নামে। তারা মিষ্টিমুখ ও উৎসবের মাধ্যমে এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা উদযাপন করেন। ঢাকার শহীদ মিনার থেকে কায়রোর আল-আজহার পর্যন্ত বিস্তৃত এই ছাত্র-জনতার ঐক্য প্রমাণ করে যে, ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক না কেন, ন্যায়বিচার ও দেশের প্রতি ভালোবাসা সবসময় সব সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়।
(নিবন্ধটি লিখেছেন কলামিস্ট ও মিশরের কায়রোতে অবস্থিত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী)



























