শিল্প বাঁচাতে মালয়েশিয়া থেকে বেশি দামে গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত
- আপডেট সময় : ০৪:৪৯:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ অগাস্ট ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

দেশের ভয়াবহ গ্যাস সংকট থেকে শিল্প-কারখানাগুলোকে রক্ষা করতে বিকল্প উপায়ে গ্যাস আমদানির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বেশি দাম দিয়ে হলেও মালয়েশিয়া থেকে ক্রায়োজেনিক লরি ট্যাংকার বা আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস ক্রয়ের ব্যাপারে একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে নীতিনির্ধারক সূত্রে জানা গেছে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ছয় মাস সময় লেগে যেতে পারে।
জ্বালানি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গত সপ্তাহে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং সহায়তা চান। এরই ধারাবাহিকতায় মালয়েশীয় কোম্পানি পেট্রোনাসের একটি প্রতিনিধি দল গত সপ্তাহে ঢাকা সফর করে আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস বিক্রির প্রস্তাব দেয়। প্রাথমিকভাবে মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা এই গ্যাস নিতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। এর পাশাপাশি জ্বালানি বিভাগ দেশীয় উৎস ভোলার গ্যাসও আইএসও পদ্ধতিতে মূল ভূখণ্ডে নিয়ে আসার কথা ভাবছে, তবে এ বিষয়ে এখনও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে দেশের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে গ্যাস সংকটকে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পূর্বে হওয়া একাধিক বৈঠকের সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রী দ্রুততম সময়ে গ্যাস সংকট সমাধানের নির্দেশ দেন। ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন, গ্যাস সংযোগের জন্য টাকা জমা দেওয়ার পরও ৫৫০টি শিল্প-কারখানা সংযোগ পাচ্ছে না। বর্তমানে বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে মোট ১ হাজার ৮৫৭টি শিল্প-কারখানার গ্যাস সংযোগের আবেদন ঝুলে রয়েছে।
বিনিয়োগ সংক্রান্ত ওই বৈঠকের পর দুপুরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা আরেকটি বৈঠকে বসেন। সেই বৈঠকেই পেট্রোনাসের কাছ থেকে আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস আমদানির বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়। তবে এই গ্যাসের দাম পড়বে বর্তমানের তুলনায় তিনগুণেরও বেশি। বর্তমানে সরকার প্রতি ইউনিট গ্যাস শিল্প গ্রাহকদের কাছে ৩১ টাকায় বিক্রি করছে। অন্যদিকে, পেট্রোনাস এই গ্যাস শুধু চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত সরবরাহ করতেই প্রতি ইউনিটের দাম দাবি করছে ১০০ টাকা। গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাতে এই গ্যাসের খরচ আরও বাড়বে।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে জানানো হয়েছে, সংকট দ্রুত কাটাতে মালয়েশিয়া ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া থেকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হবে। বাংলাদেশের জন্য আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস আমদানি একেবারেই নতুন একটি অভিজ্ঞতা। পেট্রোনাসের প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০ ফুটের ট্যাংকে ৯ টন এবং ৪০ ফুটের ট্যাংকে ১৮ টন এলএনজি জাহাজে করে বাংলাদেশে পাঠানো সম্ভব। প্রতিটি জাহাজে প্রায় ৬০০টি ট্যাংক থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে লরির মাধ্যমে এই ট্যাংকগুলো সরকারের গ্যাস পাইপলাইন অথবা সরাসরি বিভিন্ন ফ্যাক্টরি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। তবে এজন্য ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আঙিনায় রিজার্ভ ট্যাংক এবং রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট স্থাপন করতে হবে, যার জন্য নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে। পেট্রোনাস জানিয়েছে, এই ট্যাংকারগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাতে প্রায় ৭ দিন সময় লাগবে।
চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম এমনিতেই চড়া। বর্তমানে পেট্রোবাংলাকে প্রতি ইউনিট এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে ৬৬ টাকায়। পেট্রোনাসের প্রস্তাবিত এলএনজির দাম এই চড়া মূল্যের চেয়েও অনেক বেশি। গত ২১ জুলাই মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশের গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ কমে গেছে ৫১ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস, যার কারণে দেশের অধিকাংশ শিল্প-কারখানা এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
দেশে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো, যা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে ২১৪ কোটি ঘনফুটে। ঝুলে থাকা ১ হাজার ৮৫৭টি শিল্প-কারখানায় নতুন সংযোগ দিতে হলে দৈনিক আরও অন্তত ৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন।
জানা গেছে, গতকাল সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বাংলাদেশের বিনিয়োগ নিয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সব নীতিনির্ধারকরা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে দেশের শিল্পায়নের জন্য গ্যাস সংকটকে অন্যতম বাধা হিসাবে উল্লেখ করা হয়। দেশে বিনিয়োগ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে এ সময় প্রধানমন্ত্রী গ্যাসের সংকট দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন। ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, টাকা জমা দিয়েও ৫৫০টি শিল্প-কারখানা গ্যাসের সংযোগ পাচ্ছে না। সব মিলিয়ে ১৮৫৭টি শিল্প-কারখানা গ্যাসের আবেদন জমা হয়ে আছে বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির কাছে।

























