আমলাদের বদলে শীর্ষ সরকারি পদে রাজনীতিকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ

- আপডেট সময় : ০৯:২৯:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬ ৩ বার পড়া হয়েছে

সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের পরিবর্তে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির রাজনৈতিক নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ১২টি প্রতিষ্ঠানে এক বছরের জন্য এই নিয়োগ দিয়েছে সরকার, যার মধ্যে ১১টি পদই গ্রেড-২ মর্যাদার। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে তীব্র ক্ষোভ ও চরম হতাশা দেখা দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জারি করা আদেশে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক পদে মো. সালাহউদ্দিন সরকার, বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে মোহাম্মদ রাশেদুল হক, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান পদে এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে মো. কামরুজ্জামান, বিএসইসির চেয়ারম্যান পদে আবদুল খালেক, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে মো. শামসুজ্জামান, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কাজী রওনাকুল ইসলাম, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে মো. জাকির হোসেন, বিসিকের চেয়ারম্যান পদে বেনজীর আহমেদ এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে মো. মামুন হাসানকে গ্রেড-২ পদমর্যাদায় এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই পদের সবাই ক্ষমতাসীন দল বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন। তবে সাবেক সচিব জাকির হোসেন কামালকে বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও তিনি শেষ পর্যন্ত যোগ দেননি। এছাড়া নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলম।
নিয়মিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, শীর্ষ পদগুলোতে নিয়মিত পদোন্নতি না দিয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের এই প্রবণতা প্রশাসনের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতাকে দুর্বল করছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাচের কর্মকর্তারা জানান, মাঠ প্রশাসন ও সচিবালয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পরও তারা পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একজন অতিরিক্ত সচিব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মেধা, যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পদোন্নতিই কর্মকর্তাদের কাজের মূল অনুপ্রেরণা। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো চুক্তিভিত্তিক পূরণ করা হলে কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। অপর একজন কর্মকর্তা বলেন, ২৫ থেকে ৩০ বছর চাকরি করার পর অবসরের আগে একটি দপ্তরের নেতৃত্ব দেওয়ার যে স্বপ্ন কর্মকর্তারা দেখেন, তা বারবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের কারণে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এতে প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী বলেন, সরকার প্রশাসনকে একটি প্রমিত কাঠামোয় দাঁড় করাতে এবং বিশৃঙ্খলা দূর করতে চায়। সবকিছু স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে জনকল্যাণে কাজ করছে এবং প্রমাণসহ কেউ আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলতে পারবে না বলে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।
অন্যদিকে, সাবেক সচিব একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার সরকারের এই পদক্ষেপকে সঠিক বলে মনে করেন। তিনি বলেন, আমলারা একে অপরের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দলীয়করণের অভিযোগ তোলায় সরকার দলনিরপেক্ষ আমলা পাচ্ছে না। ফলে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তদের বসানোই সরকারের কাছে নিরাপদ মনে হয়েছে এবং এই পরিস্থিতির জন্য আমলারা নিজেই দায়ী।
তবে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া। তিনি বলেন, সচিব বা মহাপরিচালক—সব পদেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিরুৎসাহিত করা উচিত। বাইরের লোক দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা যাবে না এবং দলীয় লোক নিয়োগের ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রশাসনের চেহারা রাতারাতি পাল্টাতে হলে দলনিরপেক্ষ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের খুঁজে বের করে এসব পদে বসানো প্রয়োজন, যারা সরকারের তোষামোদি বা পা চাটবে না।


























