১৮ জুলাইয়ের আন্দোলনে যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
- আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ ৪ বার পড়া হয়েছে

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই সকাল ৭টায় কাউকে কিছু না বলে মেয়েটি বাসা থেকে বের হয়ে যায়। সকাল সোয়া ৯টা। দেশজুড়ে চলছে কমপ্লিট শাটডাউন। ফেসবুকের পর্দায় ভেসে উঠল ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির গেটের ভেতরে পুলিশ কর্তৃক শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেওয়ার দৃশ্য। ঠিক আগের দিন আবু সাঈদ ও ওয়াসিমসহ ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল চরম উত্তেজনা। প্রশাসনের কড়াকড়িতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো খালি, রাজু ভাস্কর্য বা টিএসসিতে জড়ো হওয়ার সুযোগ নেই। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা ডিসকোর্ড অ্যাপ ও ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালায়।
প্রাইভেট ভার্সিটির এক শিক্ষার্থীর মা জানান, তার মেয়েও সাহসের সাথে আন্দোলনে নেমেছিল। মেয়ে বলছিল, ফেলো শিক্ষার্থীরা গুলি খেয়ে মরবে আর সে ঘরে বসে থাকবে না। একাত্তরের প্রেক্ষাপট টেনে মেয়েটি তার মায়ের কাছে নিজের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানায়। ১৮ জুলাই সকালে পরিকল্পনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা ভার্সিটির গেটে জড়ো হয় এবং আইডি কার্ড ছাড়া কাউকে প্রবেশ করতে না দেওয়ার নির্দেশ ছিল তাদের।
পুলিশের ধাওয়ায় শিক্ষার্থীরা পিছু হটলেও ব্র্যাকের গেট খুলে দেওয়া হলে ভেতরে টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন ইস্ট ওয়েস্ট, নর্থ সাউথসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ব্র্যাকের দিকে ছুটে আসে। রোকেয়া সরণি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে থাকা শিক্ষার্থীরা মুখ ও হাতে পেস্ট মেখে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পুলিশ ক্যাম্পাসের ভেতরে গুলি চালালে শিক্ষার্থীরাও লাঠি নিয়ে এবং পুলিশের ছোড়া টিয়ার শেল পাল্টা নিক্ষেপ করে প্রতিরোধ শুরু করে।
এক পর্যায়ে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ভেতরে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের থামাতে যায় শিক্ষার্থীরা। এর ৩০-৩৫ মিনিট পর জানা যায়, দোতলায় আটকে পড়া পুলিশ ছাদে উঠে গেছে, তাদের গুলি ও টিয়ার শেল শেষ। কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সিঁড়ি দখল করে আছে স্টুডেন্টরা। উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় যেমন উত্তরা, সাভার ও যাত্রাবাড়ীতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরার নর্দান ইউনিভার্সিটির আসিফ ও শাকিলসহ বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর আসে। ধানমন্ডিতে নিহত হয় রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফায়াজ। বিকেলে কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির ছাদ থেকে পুলিশ সদস্যদের উদ্ধারে র্যাবের হেলিকপ্টার যাওয়ার খবর পাওয়া যায়, কিন্তু শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।
বিকালে শাহবাগে জড়ো হওয়া পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। সাড়ে ৫টার দিকে কফিন মিছিল শুরু হতেই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় ছাত্র-জনতা। দীর্ঘ সময় বিরতি দিয়ে বিকাল সাড়ে ৫টায় মেয়ে আমাকে ফোন করে জানায়, সে বাড়ি ফিরতে চায়। রাস্তায় কোনো বাস বা রিকশা নেই, পুলিশ নেই। শিক্ষার্থীরা ফিরছে। তার আর হাঁটার শক্তি নেই। অবশেষে সহকর্মীর সহায়তায় মেয়েকে অফিসে ফিরিয়ে আনা হয়। আমার টুকটুকে ফর্সা তালপাতার সিপাই মেয়েটি তখন রোদে পুড়ে কুচকুচে কালো হয়ে গেছে।

























