উত্তরাধিকার সম্পদে নারীর অধিকার ও ইসলামি বিধানের ন্যায্যতা
- আপডেট সময় : ০৫:১৩:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

তৎকালীন পৃথিবীর অধিকাংশ সমাজে যখন নারীকে সম্পত্তির মালিকানা দেওয়ার পরিবর্তে নিজেই সম্পত্তির অংশ হিসেবে গণ্য করা হতো, ঠিক সেই অন্ধকার সময়ে ইসলাম নারীর উত্তরাধিকারের সুনির্দিষ্ট অংশ নিশ্চিত করে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এটি কোনো মানুষের তৈরি আইন নয়, বরং স্বয়ং মহান আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। তবে দুঃখজনক বাস্তবতার কারণে আমাদের সমাজে আজও বহু নারী পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পারিবারিক ও সামাজিক চাপ, লোকলজ্জা, ভাইদের প্রভাব এবং ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেক নারী তাঁদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে পারেন না।
ইসলামের আবির্ভাবের আগে আরবের জাহেলি সমাজে উত্তরাধিকারের নিয়ম ছিল কেবল শক্তিশালী পুরুষদের জন্য। সেখানে নারী, শিশু ও দুর্বলদের কোনো অধিকার ছিল না। এমনকি মৃত স্বামীর সম্পদের অংশ হিসেবে স্ত্রীকে গণ্য করা হতো এবং মৃত ব্যক্তির ছেলে চাইলে তার সৎমাকেও নিজের অধীনে নিয়ে নিতে পারত। নারীর প্রতি এমন চরম অবমাননাকর পরিস্থিতির বিবরণ পাওয়া যায় তাফসিরে ইবনে কাসিরে (২/১৭৯, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)। এই প্রথার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে পবিত্র কোরআনের সুরা নিসার ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে পুরুষ ও নারী উভয়েরই নির্ধারিত অংশ রয়েছে, তা সম্পদের পরিমাণ কম হোক বা বেশি। এই ঘোষণা ছিল ইতিহাসের এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা নারীকে উত্তরাধিকারের একটি স্বাধীন ও অপরিবর্তনযোগ্য অধিকার দান করে।
ইসলামি উত্তরাধিকার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি কোনো মানুষের ইচ্ছাধীন নয়। সুরা নিসার ১১, ১২ ও ১৭৬ নম্বর আয়াতে মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোনের অংশ সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কন্যার উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, একজন পুত্র দুজন কন্যার সমান অংশ পাবে। যদি কোনো ব্যক্তির কেবল একজন কন্যা থাকে, তবে তিনি মোট সম্পদের অর্ধেক পাবেন। আর দুই বা ততোধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ সম্পদের অধিকারী হবেন। মায়ের ক্ষেত্রে বিধান হলো, মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে মা পাবেন এক-ষষ্ঠাংশ। সন্তান না থাকলে এবং একাধিক ভাই-বোন না থাকলে মা এক-তৃতীয়াংশ পাবেন, তবে একাধিক ভাই-বোন থাকলে মায়ের অংশ হবে এক-ষষ্ঠাংশ।
স্ত্রীর অধিকারের ক্ষেত্রে সুরা নিসার ১২ নম্বর আয়াত অনুযায়ী, স্বামীর কোনো সন্তান না থাকলে স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ সম্পদ পাবেন, আর সন্তান থাকলে পাবেন এক-অষ্টমাংশ। বোনের উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে বিধান হলো, মৃত ব্যক্তির সন্তান এবং পিতা বা দাদা না থাকলে এবং কেবল একজন বোন থাকলে তিনি সম্পদের অর্ধেক পাবেন। দুই বা ততোধিক বোন থাকলে এবং ভাই না থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ পাবেন। আর ভাই ও বোন উভয়ই থাকলে একজন ভাইয়ের অংশ হবে দুজন বোনের অংশের সমান। এভাবে কন্যা, স্ত্রী, মা কিংবা বোন—প্রতিটি পরিচয়েই নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে ইসলামে নারী সবসময় পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। প্রকৃত অর্থে সব ক্ষেত্রে এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। যেমন, মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে মা ও বাবা উভয়েই সমান এক-ষষ্ঠাংশ করে সম্পদ পান। যেখানে ছেলে ও মেয়ের অংশে তারতম্য ঘটে, তার পেছনে রয়েছে ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভারসাম্য। ইসলামে পরিবারের ভরণপোষণ, স্ত্রী-সন্তানের ব্যয়ভার এবং দেনমোহর প্রদানের মতো সব আর্থিক দায়িত্ব পুরুষের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। পক্ষান্তরে, নারীর ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর এমন কোনো বাধ্যতামূলক খরচ চাপানো হয়নি। ফলে পারিবারিক দায়িত্ব ও আর্থিক দায়বদ্ধতার নিরিখেই এই বণ্টন নির্ধারণ করা হয়েছে, মর্যাদার ভিত্তিতে নয়।
ইসলামে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করাকে কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। বিশেষ করে আল্লাহ নির্ধারিত নারীর অংশ আত্মসাৎ করা আরও বড় অপরাধ। বোন বা কন্যাকে কৌশলে বঞ্চিত করা, জোর করে লিখিত ছাড়পত্র নেওয়া কিংবা বিভিন্ন অজুহাতে তাদের হিস্যা আটকে রাখা আল্লাহর বিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন। সুরা বাকারা-র ১৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করতে নিষেধ করেছেন। উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান বর্ণনা করার পরপরই সুরা নিসার ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা; যারা এই সীমা লঙ্ঘন করবে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। এছাড়া সহিহ বুখারির ২৪৫৩ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও এক বিঘত জমিও দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তর জমিনের বোঝা ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।
বাস্তব সমাজে নারীদের বঞ্চিত হওয়ার পেছনে ধর্মীয় অজ্ঞতা ও অতিরিক্ত লোভ কাজ করে। অনেক সময় বোনদের আবেগীয়ভাবে চাপ দেওয়া হয় যে সম্পত্তি দাবি করলে ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হবে কিংবা বাপের বাড়ির সম্মান ক্ষুণ্ন হবে। ইসলাম এমন মানসিকতাকে সমর্থন করে না। এছাড়া অনেক পরিবারে বছরের পর বছর উত্তরাধিকার বণ্টন ঝুলিয়ে রাখা হয়, যা জটিলতা ও মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি করে। তাই মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনে বিলম্ব না করে দ্রুত শরিয়ত অনুযায়ী হিস্যা বুঝিয়ে দেওয়া জরুরি।
নারীর এই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে পরিবারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং অনুমান বা প্রচলিত প্রথার ওপর নির্ভর না করে ফরায়েজ বা উত্তরাধিকার আইন বিশেষজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ নিতে হবে। একই সাথে নারীদেরও নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে তা দাবি করতে হবে। আল্লাহর নির্ধারিত এই অধিকার আদায় ও প্রতিষ্ঠার মাঝেই পরিবার ও সমাজের প্রকৃত কল্যাণ নিহিত রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকার জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ীর মুহাদ্দিস ফয়জুল্লাহ রিয়াদ।



























