পরাশক্তির খেলায় পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের বাজি কি কাজে লাগবে
- আপডেট সময় : ০৯:৪৫:৪১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য ভৌগোলিক অবস্থান পরিবর্তনের সুযোগ নেই, কিন্তু সেই অবস্থানকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা নির্ধারণ করার সুযোগ তাদের হাতে থাকে। দক্ষিণ এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং চীনের সংযোগস্থলে অবস্থিত পাকিস্তান নিজেকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, যাকে কোনো পরাশক্তিই উপেক্ষা করতে পারবে না। ইসলামাদের এই হিসাব-নিকাশ কোনো কূটনৈতিক মিষ্টি কথায় নয়, বরং কঠোর বাস্তববাদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
জবিগনিউ ব্রজেজিনস্কি তাঁর 'দ্য গ্র্যান্ড চেসবোর্ড' বইতে পাকিস্তানকে 'জিওপলিটিক্যাল পিভট' বা ভূরাজনৈতিক অক্ষশক্তি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। দেশটির গুরুত্ব তার নিজস্ব ক্ষমতা থেকে নয়, বরং ইরান, চীন ও ভারতের সীমান্তবর্তী সংবেদনশীল ভৌগোলিক অবস্থান থেকে আসে। পাকিস্তান উপসাগরীয় মূলধন এবং মধ্য এশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের সংযোগকারী রুটগুলোর কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে।
সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি' পাকিস্তানের এই প্রাসঙ্গিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এই চুক্তির ফলে রিয়াদ পাচ্ছে পারমাণবিক ক্ষমতাধর এক প্রতিরক্ষা অংশীদার, আর ইসলামাবাদ পাচ্ছে সৌদি মূলধন ও ইউরোপের বাজারে শিল্প প্রসারের সুযোগ। অন্যদিকে, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে পাকিস্তান এমন সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য পাচ্ছে যা অন্য কোনো উপসাগরীয় রাষ্ট্র দিতে সক্ষম নয়। এছাড়া ইরান ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের অপ্রকাশ্য যোগাযোগের পথগুলো একে এক অনন্য তৃতীয় স্তম্ভে পরিণত করেছে।
চীনের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব কেবল গোয়াদর বা সিপেকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বেইজিং ইরানের ৯০ শতাংশ তেল ছায়া জাহাজের মাধ্যমে কিনে থাকে, যা তেহরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপসাগরীয় অঞ্চলে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের ভবিষ্যৎ এবং জ্বালানি সম্পদের নিরাপত্তার জন্য বেইজিং চায় না ইরান মার্কিন প্রভাববলয়ে চলে যাক। ভারত নিয়ন্ত্রিত মার্কিন কোয়াড জোটের বিপরীতে পাকিস্তান বেইজিংয়ের জন্য এক কৌশলগত রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
পাকিস্তানের নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছে যে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে জয়ী হওয়ার চেয়ে প্রতিটি ব্লকের কাছে নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তোলা বেশি কার্যকর। তবে হেনরি কিসিঞ্জারের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, ক্ষমতার ভারসাম্য কখনোই স্থির থাকে না। পাকিস্তান যদি রিয়াদের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে তবে তেহরানের আস্থা হারাবে, আবার বেইজিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা ওয়াশিংটনের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দিতে পারে।
এই কৌশলের পেছনে তিনটি প্রধান ঝুঁকি রয়েছে। প্রথমত, 'ব্লক ক্যাপচার' বা কোনো এক শক্তির পকেটে পুরোপুরি চলে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, 'ওভারএক্সটেনশন' বা নিজেদের সক্ষমতার বাইরে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেলা। তৃতীয়ত, আস্থার ঘাটতি, যা পাকিস্তানের দর-কষাকষির ক্ষমতাকে বিলুপ্ত করতে পারে। শেষ পর্যন্ত, এই বাজি সফল হলে পরাশক্তিগুলো যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে পাকিস্তানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার কথা বিবেচনা করতে বাধ্য হবে, আর ব্যর্থ হলে পাকিস্তান কেবল অন্য শক্তির অধীনের রাষ্ট্রে পরিণত হবে।





























