ঢাকা ০৪:৩২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ভোলায় এনসিপির কমিটি ঘোষণার পরপরই সাংগঠনিক সম্পাদকের পদত্যাগ এফবিআইয়ের হাজারো কর্মকর্তার সংবেদনশীল তথ্য চুরির দাবি হ্যাকারদের তেলুগু তারকা নানির ক্যারিয়ার, সম্পদ ও আসন্ন সিনেমার গল্প জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন সৌন্দর্যের ভেতর ইতিহাসের শরীর: হেগেল ও মার্কসের নন্দনতত্ত্বের তুলনামূলক পাঠ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের যেখানেই পাওয়া যাবে সেখানেই প্রতিহত করা হবে: এস এম জিলানী জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা বনশ্রীতে কুকুরকে খাওয়াতে গিয়ে তরুণীকে মারধর, থানায় অভিযোগ ঈশ্বরদীতে ক্রেতা সেজে দুই ভরি স্বর্ণের মালা নিয়ে চম্পট গোপালগঞ্জে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ

মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে ঝুঁকির আশঙ্কা: হুমায়ুন কবির

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ১১:৫২:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে চলমান ভূরাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবির। সম্প্রতি প্রথম আলোর পক্ষে সহুল আহমদের নেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই চুক্তির প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশের জন্য এর সুবিধা-অসুবিধা এবং দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

এম হুমায়ুন কবির জানান, মক্কা চুক্তির পেছনে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তৎপরতায় সৃষ্ট নিরাপত্তাশূন্যতা কাজ করছে। ইরান বিপ্লবের পর দেশটিকে চাপে রাখতে মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতৃত্বে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তাবলয় গড়ে উঠেছিল। তবে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধে মার্কিন ঘাঁটিগুলো আক্রান্ত হওয়ায় এই নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সৌদি আরব। পাশাপাশি ন্যাটোভুক্ত দেশ তুরস্কও ইসরায়েলি হুমকির মুখে ন্যাটোর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে না পেরে নতুন এই নিরাপত্তা কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার তাগিদ দেখছে। গাজায় নৃশংসতা, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এবং মার্কিন প্রভাব কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট শূন্যতা থেকেই মূলত এই আংশিক নিরাপত্তা কাঠামোর উদ্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশে এই চুক্তি নিয়ে আগ্রহের পেছনে দুটি কারণ দেখছেন এই সাবেক কূটনীতিক। প্রথমত, ধর্মীয় আবেগ থেকে অনেকে মনে করছেন এই জোটে যোগ দিলে মুসলিম দেশগুলোর সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার হবে। দ্বিতীয়ত, ভারতের সঙ্গে বর্তমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে সৃষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে অনেকে একে একটি বিকল্প ভাবছেন। তবে হুমায়ুন কবির স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কখনোই কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি এবং জাতিসংঘের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক বা শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেয়নি। বর্তমান সরকারের ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির মূল ভিত্তিও হলো সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। ফলে এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ অবস্থান ক্ষুণ্ন হবে।

চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাড়তি সুবিধা। তবে এর বিপরীতে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশ সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া এটিকে ‘সুন্নি জোট’ হিসেবে দেখা হলে অন্য ধারার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হবে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে বৈদেশিক বাণিজ্যে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান রুট লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি বর্তমানে ইয়েমেনের হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হুতিরা এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। অথচ তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমেই বাংলাদেশ কোনো ঝুঁকি ছাড়াই এসব সুবিধা ভোগ করছে।

ভারতের উদ্বেগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের যেকোনো সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের নিরিখে নেওয়া উচিত, যেখানে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই মূল চালিকাশক্তি। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পরাশক্তিই বাংলাদেশের বর্তমান ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাকে সমর্থন করবে বলে তিনি মনে করেন। কারণ চীন যেমন ইরানের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং ২০২৩ সালে সৌদি-ইরান সমঝোতায় ভূমিকা রেখেছে, তেমনি তারা বাংলাদেশে কোনো সংঘাত চায় না। যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা কামনা করে। হুমায়ুন কবিরের মতে, এই ধরনের কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার মতো বড় সিদ্ধান্ত কেবল সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়া উচিত নয়। এর জন্য জাতীয় সংসদ, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের সঙ্গে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ আলোচনার মাধ্যমে সব অংশীজনের মতামত নেওয়া জরুরি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে ঝুঁকির আশঙ্কা: হুমায়ুন কবির

আপডেট সময় : ১১:৫২:২৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে চলমান ভূরাজনৈতিক আলোচনার মধ্যে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) সভাপতি এম হুমায়ুন কবির। সম্প্রতি প্রথম আলোর পক্ষে সহুল আহমদের নেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই চুক্তির প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশের জন্য এর সুবিধা-অসুবিধা এবং দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

এম হুমায়ুন কবির জানান, মক্কা চুক্তির পেছনে মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তৎপরতায় সৃষ্ট নিরাপত্তাশূন্যতা কাজ করছে। ইরান বিপ্লবের পর দেশটিকে চাপে রাখতে মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতৃত্বে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক নিরাপত্তাবলয় গড়ে উঠেছিল। তবে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধে মার্কিন ঘাঁটিগুলো আক্রান্ত হওয়ায় এই নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে বড় প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সৌদি আরব। পাশাপাশি ন্যাটোভুক্ত দেশ তুরস্কও ইসরায়েলি হুমকির মুখে ন্যাটোর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে না পেরে নতুন এই নিরাপত্তা কাঠামোতে যুক্ত হওয়ার তাগিদ দেখছে। গাজায় নৃশংসতা, আব্রাহাম অ্যাকর্ডস এবং মার্কিন প্রভাব কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট শূন্যতা থেকেই মূলত এই আংশিক নিরাপত্তা কাঠামোর উদ্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশে এই চুক্তি নিয়ে আগ্রহের পেছনে দুটি কারণ দেখছেন এই সাবেক কূটনীতিক। প্রথমত, ধর্মীয় আবেগ থেকে অনেকে মনে করছেন এই জোটে যোগ দিলে মুসলিম দেশগুলোর সংহতি ও জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার হবে। দ্বিতীয়ত, ভারতের সঙ্গে বর্তমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে সৃষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগ থেকে অনেকে একে একটি বিকল্প ভাবছেন। তবে হুমায়ুন কবির স্মরণ করিয়ে দেন যে, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ কখনোই কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি এবং জাতিসংঘের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া কোনো আন্তর্জাতিক সামরিক বা শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নেয়নি। বর্তমান সরকারের ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির মূল ভিত্তিও হলো সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। ফলে এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ অবস্থান ক্ষুণ্ন হবে।

চুক্তিতে যোগ দেওয়ার সম্ভাব্য সুবিধার মধ্যে রয়েছে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাড়তি সুবিধা। তবে এর বিপরীতে বড় ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, এই জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশ সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের অংশ হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া এটিকে ‘সুন্নি জোট’ হিসেবে দেখা হলে অন্য ধারার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হবে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে বৈদেশিক বাণিজ্যে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান রুট লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি বর্তমানে ইয়েমেনের হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হুতিরা এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারে। অথচ তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমেই বাংলাদেশ কোনো ঝুঁকি ছাড়াই এসব সুবিধা ভোগ করছে।

ভারতের উদ্বেগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের যেকোনো সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের নিরিখে নেওয়া উচিত, যেখানে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই মূল চালিকাশক্তি। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পরাশক্তিই বাংলাদেশের বর্তমান ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখাকে সমর্থন করবে বলে তিনি মনে করেন। কারণ চীন যেমন ইরানের পক্ষে দাঁড়িয়েছে এবং ২০২৩ সালে সৌদি-ইরান সমঝোতায় ভূমিকা রেখেছে, তেমনি তারা বাংলাদেশে কোনো সংঘাত চায় না। যুক্তরাষ্ট্রও নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা কামনা করে। হুমায়ুন কবিরের মতে, এই ধরনের কোনো প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়ার মতো বড় সিদ্ধান্ত কেবল সরকারের অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়া উচিত নয়। এর জন্য জাতীয় সংসদ, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের সঙ্গে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ আলোচনার মাধ্যমে সব অংশীজনের মতামত নেওয়া জরুরি।

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo