সরকারি কলেজ শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার নেপথ্যে কী?
- আপডেট সময় : ০৮:২৫:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে

সম্প্রতি ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির সম্মানিত উপাচার্যের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সরকারি কলেজের শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদানের যোগ্যতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে। জনসমক্ষে বা আড়ালে অনেকেই সরকারি কলেজগুলোতে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম বন্ধের পক্ষে মত দিচ্ছেন এবং এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর জন্য আলাদাভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের দাবি তুলছেন। তবে শিক্ষাবিদদের মতে, এই বিতর্ক নতুন নয় বরং এর পেছনে রয়েছে উচ্চশিক্ষা খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সমস্যা।
ঐতিহাসিকভাবে কলেজগুলো ছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মূল ভিত্তি। অতীতে অক্সফোর্ড বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণায় কলেজগুলোই ছিল উচ্চশিক্ষার প্রধান কেন্দ্র, যেখানে বিদ্যাসাগর, ডিরোজিও, জগদীশচন্দ্র বসু ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিরা পাঠদান করেছেন। ষাট ও সত্তরের দশকে শওকত ওসমান, মমতাজউদ্দীন আহমদ, দার্শনিক সাইদুর রহমান, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, আবুল ফজল, আ ন ম বজলুর রশীদ, আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন, মঞ্জুশ্রী রায়চৌধুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও কবীর চৌধুরীর মতো উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বরা কলেজগুলোতে শিক্ষকতা করেছেন, তখন তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
শূন্য দশকের পর যখন দেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়ে গেল এবং বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠল সহজ কর্মসংস্থানের উপায়, তখন থেকেই কলেজভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা আক্রান্ত হতে শুরু করে। ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের মাধ্যমে সে যাত্রার সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে দেশের একমাত্র সরকারি আর্ট কলেজটিও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে যায়। দেখা গেল একই অবকাঠামো ও উৎস থেকে অর্থায়ন সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকসংখ্যা ও অর্থ বরাদ্দে আমূল পরিবর্তন এল। ফলে কলেজগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠল, যদিও এতে শিক্ষাব্যয় বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তাঁর যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারলে ১ নম্বর বেতন গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ পান, কিন্তু সরকারি কলেজের শিক্ষকরা ৪ নম্বর গ্রেডের ওপরে উঠতে পারেন না। এছাড়া কলেজগুলোতে গবেষণাভিত্তিক উচ্চশিক্ষা চালানোর কোনো নীতি বা অবকাঠামোগত সুযোগ নেই। বরং সক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে কলেজগুলোকে অনেকটা হাটবাজারে রূপান্তর করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, কলেজগুলোর শিক্ষার মান দেখার জন্য যে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানেও ঊর্ধ্বতন পদে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই বসেন। তাই এই দায় তারা এড়াতে পারেন না।
সরকারি মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতে সরকারি কর্মকমিশনের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলেও সেগুলোর শিক্ষার মান নিয়ে পণ্ডিত মহলে কোনো উদ্বেগ নেই। কারণ, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা পরবর্তী জীবনে ভালো রোজগারি হয়ে ওঠে। অর্থাৎ গবেষণার চেয়ে অর্থই এখানে মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা কলেজের শিক্ষকদের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈষম্যকে প্রকট করেছে।
সরকারি কলেজগুলোতে শিক্ষক নিয়োগপ্রক্রিয়া দেশের সবচেয়ে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক। মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকা প্রার্থীরা অনেক সময় উপজেলা পর্যায়ের কলেজে পদায়ন পান, অথচ পেছনের সারির অনেকে ঢাকার শীর্ষ কলেজে সুযোগ পান। গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষকরা উচ্চশিক্ষা শেষে ফিরে এসেও বঞ্চনার শিকার হন এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের কলেজে পদায়িত হন। এই আত্মহননমূলক প্রক্রিয়ায় মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী তরুণেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারি কলেজের উচ্চশিক্ষা বন্ধ না করে বরং শিক্ষার মান উন্নয়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশ্লেষকরা।





























