রাশিয়ায় নির্মাণকাজের প্রলোভনে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো বাংলাদেশিদের দেশে ফেরার আকুতি
- আপডেট সময় : ১০:২৭:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

উন্নত জীবনের আশায় ও ভালো উপার্জনের স্বপ্নে চলতি বছরের ৭ মে একদল নির্মাণশ্রমিক হিসেবে রাশিয়ায় যান ৩০ জন বাংলাদেশি। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি না দিয়ে তাদের নেওয়া হয় সেনা ক্যাম্পে। পরে প্রতারণার মাধ্যমে বাধ্য করা হয় রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে। যুদ্ধের ভয়াবহতায় ওই ৩০ জনের মধ্যে অন্তত ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে, ৬ জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আটকা পড়ে আছেন এবং দুজন হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন। বাকি দুজন গুরুতর আহত অবস্থায় রাশিয়ার দুটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থেকে দেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছেন।
আহত ব্যক্তিদের একজন মো. আলী হাসান সোহেল। তাঁর বাড়ি রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলায়। বর্তমানে তিনি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে পেনজা শহরের একটি হাসপাতালে ১ মাস ১০ দিন ধরে চিকিৎসাধীন আছেন। হাসপাতালে শয্যাশায়ী আলী হাসান কাঁদতে কাঁদতে জানান, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের মতো কর্মীদের একপ্রকার ফাঁদে ফেলা হয়। যুদ্ধে যেতে রাজি না হলে বন্দী রেখে মারধর ও কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। একপর্যায়ে হাতে অস্ত্র ও পরনে সেনাপোশাক তুলে দিয়ে সামনের সারিতে ঠেলে দেওয়া হয়।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে আলী হাসান জানান, ৩০ জনের দলটিকে সেনাক্যাম্পে নিয়ে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। তিনি ছিলেন ১৬ জনের একটি দলে। মাত্র পাঁচ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ষষ্ঠ দিনে তাঁদের পাঁচজনকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। তিন দিন ধরে মাইলের পর মাইল হেঁটে শুকনো খাবার খেয়ে মাটির নিচের এক সুড়ঙ্গ সেনাক্যাম্পে পৌঁছান তারা। পরে বাকি ১১ জনও সেখানে যোগ দেন। এরপর তাদের অস্ত্র দিয়ে বলা হতো সাধারণ টহল দেওয়ার কথা, যা মূলত মরণফাঁদ। ইউক্রেনীয় ড্রোনের নজরে পড়লেই শুরু হতো হামলা। আলী হাসানের দলের ১৬ জনের মধ্যে ১৪ জনই এখন নিখোঁজ এবং বাকি দুজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, এক বছরেও পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারবেন কি না জানেন না, তাই যেভাবেই হোক তাকে পরিবার ও দেশের মাটিতে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ চান।
একই দুর্ঘটনায় আহত আরেক বাংলাদেশি মো. পলাশ শেখ। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জের সদর উপজেলায়। উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় ধারদেনা ও চড়া সুদে ঋণ নিয়ে গত ৭ মে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন তিনি। প্রথম দফায় আলী হাসানের সঙ্গে যুদ্ধে পাঠানো পাঁচজনের দলেই ছিলেন পলাশ। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় তাঁর একটি হাত উড়ে গেছে। মস্কোর একটি হাসপাতালে গত ২৪ দিন ধরে তিনি ভর্তি আছেন। পলাশের ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম জানান, এক হাত হারিয়ে তিনি এখন চিকিৎসাধীন এবং আর যুদ্ধে পাঠানোর সম্ভাবনা কম। পলাশ যেকোনো মূল্যে দেশে ফিরতে চান।
স্বজনদের উদ্ধারে ইতিমধ্যে ঢাকার প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। গত ২৬ জুলাই আলী হাসানের স্ত্রী আকলিমা খাতুন এবং পলাশ শেখের বোন চুমকি খানম পৃথক আবেদন জমা দেন। আবেদনে তাঁরা জানান, পাওনাদারদের ঋণের কিস্তির চাপে পরিবারগুলো দিশেহারা। তারা স্বজনদের উদ্ধার ও দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক পদক্ষেপের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তার অনুরোধ জানিয়েছেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় কর্মী যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে, যা গত তিন বছরে কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে কাজের প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে অনেককেই যুদ্ধের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাশিয়ায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে রাশিয়ায় নিহত বাংলাদেশিদের লাশ দেশে ফেরানো হয় না এবং পরিবারগুলো কোনো ক্ষতিপূরণও পায় না। এই বিষয়ে ঢাকায় অবস্থিত রুশ দূতাবাসের কাছে ই-মেইলে বক্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন তৈরি পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
এদিকে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও রাশিয়ার মস্কোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, দেশে ফেরার জন্য চিকিৎসাধীন আহতদের কেউ এখনো তাঁদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেননি। তবে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা সুস্থ হওয়ার পর দেশে ফেরানোর চেষ্টার আশ্বাস দিয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের স্বজনেরা জানিয়েছেন।
বিষয়টিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরুর (RMMRU) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, রাশিয়ার সরকারের সঙ্গে অবিলম্বে কূটনৈতিক যোগাযোগ করে হাসপাতালে ভর্তি বাংলাদেশিদের পূর্ণ দায়িত্ব বাংলাদেশ দূতাবাসকে নিতে হবে। তাঁদের চিকিৎসা খরচ, বকেয়া পাওনা এবং ক্ষতিপূরণ রাশিয়ার কাছ থেকে আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে এবং সুস্থ হওয়া মাত্রই দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে।



























