শীতলপাটির ঐতিহ্য রক্ষায় রাবির চার শিক্ষার্থীর স্যান্ডেল তৈরির উদ্যোগ
- আপডেট সময় : ১১:০৬:৩৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে

এক সময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে গরমের ক্লান্তি দূর করতে ব্যবহৃত হতো শীতলপাটি। মুর্তা বা বেতি গাছের ছাল দিয়ে তৈরি এই পাটি কেবল দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্য ছিল না, বরং তা ছিল বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আধুনিক প্লাস্টিক ও ফোমের উপকরণের আধিক্যে এই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে, যার ফলে সংকটের মুখে পড়েছেন এই শিল্পের কারিগররা। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চার শিক্ষার্থী পুরোনো ঐতিহ্যকে নতুন আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। তারা শীতলপাটি দিয়ে তৈরি করছেন আধুনিক ও ব্যবহারযোগ্য স্যান্ডেল।
তাদের এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে 'বুনন বাজার'। দলের সদস্যরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের অপূর্ব কৃষ্ণ দে, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের আবির দে, আশিক মিয়া এবং চৌধুরী খুবাইব বিন করিম। টাঙ্গাইলের বাসিন্দা অপূর্ব কৃষ্ণ দের মাথায় প্রথম এই স্যান্ডেল তৈরির ভাবনা আসে। ছোটবেলা থেকেই নিজের পরিবারকে মুর্তা গাছ চাষ ও শীতলপাটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকতে দেখে বড় হয়েছেন তিনি। কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে কারিগরদের নিপুণ কাজ—সবই ছিল তার চেনা জগৎ। সেখান থেকেই তার মনে প্রশ্ন জাগে, শীতলপাটিকে কেবল মেঝেতে ব্যবহারের গণ্ডিতে আটকে না রেখে আধুনিক কোনো পণ্যে রূপান্তর করা সম্ভব কি না।
তবে শীতলপাটিকে স্যান্ডেলের মতো আরামদায়ক ও টেকসই পণ্যে রূপান্তর করা সহজ ছিল না। হাঁটার সময় পায়ের চাপ ও বাঁকানোসহ বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে এর মাপ, আকৃতি, কাটিং ও ফিতার অবস্থান নির্ধারণে তাদের অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়েছে। অপূর্ব জানান, প্রথম দিকে বিষয়টি বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। নিজেরা ব্যবহার করে দেখা, ক্রেতাদের মতামত নেওয়া এবং বারবার নকশা সংশোধনের মাধ্যমে তারা পণ্যের মান উন্নত করেছেন। একইসঙ্গে শীতলপাটির স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও বুনন বজায় রাখার দিকেও তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
দলের সদস্য আশিক মিয়া বলেন, এটি কেবল একটি স্যান্ডেল নয়, বরং এর সঙ্গে শীতলপাটি শিল্প ও কারিগরদের গল্প জড়িয়ে আছে। তাদের লক্ষ্য হলো, ঐতিহ্যকে কেবল জাদুঘরে সংরক্ষণ না করে আধুনিক জীবনের দৈনন্দিন অনুষঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন করা। শুরুতে পরিবার ও বন্ধুদের কাছে শীতলপাটির স্যান্ডেল তৈরির ধারণাটি কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হলেও, পরে প্রোটোটাইপের মান এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর সবার আগ্রহ ও সহযোগিতা বেড়েছে।
বুনন বাজার এখন আর কেবল একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নয়। তারা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হয়েছে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট ক্লাব আয়োজিত প্রতিযোগিতায় সেরা আটে জায়গা করে নিয়েছে। সেখানে আকিজ রিসোর্সেসের পৃষ্ঠপোষকতায় দলের চার সদস্য ইন্টার্নশিপের সুযোগ পেয়েছেন। গত ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারেও তাদের এই উদ্যোগ প্রদর্শিত হয়েছে, যেখানে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে তারা প্রশংসা পেয়েছেন। আর্থ সোসাইটির মেন্টরশিপ ও ব্যবসায়িক দিকনির্দেশনা তাদের এই পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শীতলপাটিকে আধুনিক ফ্যাশন ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন তাদের লক্ষ্য।



























