ঢাকা ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
পুতিনের সঙ্গে সফল আলোচনা, যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল পাঠাবে রাশিয়া: ট্রাম্প ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে লংমার্চ কেন খাইবার পাখতুনখাওয়ায় থমকে? দর্শনা চেকপোস্টে ভারতে পালানোর সময় হত্যা মামলার আসামি গ্রেপ্তার মঞ্চে এল হান্ট থিয়েটারের নতুন নাটক ‘তবুও প্রেম আসে’ সীতাকুণ্ডে কলাবাগানে তরুণীর হাত-পা বাঁধা লাশ, স্বামীসহ গ্রেপ্তার ৪ জ্বালানি তেলের প্রভাবে রাজধানীর বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের পাঁচ নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করল কেন্দ্রীয় কমিটি রায়গঞ্জে নারকেল গাছ পরিষ্কার করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু অসহায় মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যার শখ, সম্পন্ন করলেন ১১৩তম আয়োজন হাসপাতালে জামায়াত নেতা মুজিবুর রহমানকে দেখতে গেলেন গোলাম পরওয়ার

অসহায় মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যার শখ, সম্পন্ন করলেন ১১৩তম আয়োজন

যখন সময় ডেক্সঃ
  • আপডেট সময় : ০১:৪৫:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ ২ বার পড়া হয়েছে

Single Page Middle (336×280)

দৈনিক যখন সময় অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি



জরাজীর্ণ এক বসতবাড়ির সামনে টাঙানো হয়েছে সুদৃশ্য ফটক আর শামিয়ানা। টেবিল-চেয়ার সাজিয়ে চলছে অতিথিদের আপ্যায়নের প্রস্তুতি, পাশেই চলছে রান্নাবান্নার ব্যস্ততা। কনে সেজে সুসজ্জিত আসনে বসে আছেন তরুণী। নওগাঁর মান্দা উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে ভ্যানচালক আফছার আলীর বাড়িতে গত শুক্রবার বসেছিল এমন এক আনন্দঘন বিয়ের আসর। আফছার আলীর মেয়ে আফসানা মিমির (২০) সঙ্গে বিয়ে হয়েছে নাটোর সদর উপজেলার সবুজ মন্ডলের ছেলে কাউছার মন্ডলের (২২)। সাধারণ আর দশটা বিয়ের মতো মনে হলেও এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে এক অসাধারণ গল্প। বর কিংবা কনেপক্ষের কেউ নন, সম্পূর্ণ নিজের খরচে এই রাজকীয় বিয়ের আয়োজন করেছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের বিশিষ্ট ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী রুহুল আমিন।

পেশায় ভ্যানচালক আফছার আলী অর্থাভাবে মেয়ের বিয়ের কথা চিন্তাই করতে পারছিলেন না। এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন বড়াইগ্রামের ব্যবসায়ী রুহুল আমিনের কথা। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে মেয়ের বিয়ের জন্য সাহায্য চাইলে রুহুল আমিন তাঁকে আশ্বস্ত করেন। এরপর নাটোর সদরের কাউছার মন্ডলের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত হলে রুহুল আমিন নিজেই দায়িত্ব নেন সব আয়োজনের। গায়েহলুদের পোশাক, বর-কনের বিয়ের পোশাক, গয়নাগাটি, উপহারসামগ্রী, বিয়ের সাজসজ্জা ও খাবারের যাবতীয় খরচ তিনি একাই বহন করেন এবং নিজে উপস্থিত থেকে বিয়ে সম্পন্ন করান।

বিয়ে নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বর কাউছার মণ্ডল বলেন, ‘আমি সৌভাগ্যবান এমন একটি বিয়ের বর হতে পেরে। রুহুল আমিন আমার বিয়ের উকিল বাবা হয়েছেন। আমার স্ত্রীকে আমার হাতে সঁপে দিয়েছেন। আমাদের জন্য দোয়া করেছেন।’ কনে আফসানা মিমি বলেন, টাকার অভাবে বাবা তাঁর বিয়ে ঠিক করতে সাহস পাচ্ছিলেন না। পরে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে খবর পেয়ে বাবা রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি নিজের মেয়ের মতোই এই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করেছেন। রুহুল আমিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আফসানা বলেন, সমাজে এ ধরনের মানুষ থাকতে পারে, তা তিনি চিন্তাও করেননি।

অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়া নাটোরের বড়াইগ্রামের ওয়ালিয়া বাজারের ব্যবসায়ী রুহুল আমিনের এক অনন্য নেশা। গত ২৪ বছর ধরে তিনি এই মানবিক কাজ করে আসছেন। প্রতিটি বিয়ের তারিখ, স্থান, ছবি ও ভিডিও তিনি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে এক মেয়ের বাবা রুহুল আমিন এ পর্যন্ত ১১৩ জন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

নিজের এই ব্যতিক্রমী শখ নিয়ে রুহুল আমিন বলেন, ‘এই পৃথিবীতে অনেকের অনেক রকম শখ রয়েছে। আমি আমার উপার্জিত অর্থ দিয়ে সমাজের হতদরিদ্র মেয়েদের বিয়ে সম্পন্ন করে দিতে চাই। এটাই আমার শখ। এর বিনিময়ে এ জীবনে কিছুই চাই না। সৃষ্টিকর্তা পরকালে আমাকে নিশ্চয় প্রতিদান দেবেন। আমি এ পর্যন্ত ১১৩ জন মেয়েকে বিয়ে দিলাম। আমি মনে করি আমি ১১৩ জন মেয়ের বাবা। ওরা আমার মেয়ে-জামাই। আমার নিজের একটি মেয়ে রয়েছে।’

এর আগে গত ২১ আগস্ট রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে ১১২তম বিয়ের আয়োজন করেছিলেন রুহুল আমিন। ১০ বছর আগে বাবা হারানো সুমাইয়া জানান, তাঁর বিয়ে নিয়ে মা অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রুহুল আমিনের সহযোগিতায় অত্যন্ত ধুমধাম করে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়। একইভাবে গত ২১ জুন নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ঈশানগাতি গ্রামের রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে ১০৯তম বিয়ের আয়োজন করেন তিনি। রাবেয়া জানান, আট বছর আগে তাঁর বাবা জালাল মোল্লা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। রুহুল আমিনের সহযোগিতায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং বিয়ের পর এখনো তিনি তাঁদের খোঁজখবর নেন।

রুহুল আমিনের এই মহতী উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। ওয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম বলেন, রুহুল আমিন ওয়ালিয়া বাজারের একজন ব্যবসায়ী। তিনি মাঝেমধ্যেই গরিব–দুঃখী মেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতা করেন। নিজে উপস্থিত থেকে ধুমধাম করে নিজের মেয়ের মতোই বিয়ে দেন। পুরো বিয়ের খরচ বহন করেন। কাবিনে নিজে সাক্ষী হন। তাঁর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ।

বড়াইগ্রামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘স্থানীয় লোকজনের কাছে রুহুল আমিনের উদ্যোগে ১১২তম মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা শুনেছি। অসহায় পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে এ ধরনের সহযোগিতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তাঁর এই মানবিক কর্মকাণ্ড সমাজের অন্য বিত্তবানদেরও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করবে।’

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo

নিউজটি শেয়ার করুন

অসহায় মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যার শখ, সম্পন্ন করলেন ১১৩তম আয়োজন

আপডেট সময় : ০১:৪৫:০১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

জরাজীর্ণ এক বসতবাড়ির সামনে টাঙানো হয়েছে সুদৃশ্য ফটক আর শামিয়ানা। টেবিল-চেয়ার সাজিয়ে চলছে অতিথিদের আপ্যায়নের প্রস্তুতি, পাশেই চলছে রান্নাবান্নার ব্যস্ততা। কনে সেজে সুসজ্জিত আসনে বসে আছেন তরুণী। নওগাঁর মান্দা উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে ভ্যানচালক আফছার আলীর বাড়িতে গত শুক্রবার বসেছিল এমন এক আনন্দঘন বিয়ের আসর। আফছার আলীর মেয়ে আফসানা মিমির (২০) সঙ্গে বিয়ে হয়েছে নাটোর সদর উপজেলার সবুজ মন্ডলের ছেলে কাউছার মন্ডলের (২২)। সাধারণ আর দশটা বিয়ের মতো মনে হলেও এই আয়োজনের পেছনে রয়েছে এক অসাধারণ গল্প। বর কিংবা কনেপক্ষের কেউ নন, সম্পূর্ণ নিজের খরচে এই রাজকীয় বিয়ের আয়োজন করেছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের বিশিষ্ট ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী রুহুল আমিন।

পেশায় ভ্যানচালক আফছার আলী অর্থাভাবে মেয়ের বিয়ের কথা চিন্তাই করতে পারছিলেন না। এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন বড়াইগ্রামের ব্যবসায়ী রুহুল আমিনের কথা। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে মেয়ের বিয়ের জন্য সাহায্য চাইলে রুহুল আমিন তাঁকে আশ্বস্ত করেন। এরপর নাটোর সদরের কাউছার মন্ডলের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত হলে রুহুল আমিন নিজেই দায়িত্ব নেন সব আয়োজনের। গায়েহলুদের পোশাক, বর-কনের বিয়ের পোশাক, গয়নাগাটি, উপহারসামগ্রী, বিয়ের সাজসজ্জা ও খাবারের যাবতীয় খরচ তিনি একাই বহন করেন এবং নিজে উপস্থিত থেকে বিয়ে সম্পন্ন করান।

বিয়ে নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বর কাউছার মণ্ডল বলেন, ‘আমি সৌভাগ্যবান এমন একটি বিয়ের বর হতে পেরে। রুহুল আমিন আমার বিয়ের উকিল বাবা হয়েছেন। আমার স্ত্রীকে আমার হাতে সঁপে দিয়েছেন। আমাদের জন্য দোয়া করেছেন।’ কনে আফসানা মিমি বলেন, টাকার অভাবে বাবা তাঁর বিয়ে ঠিক করতে সাহস পাচ্ছিলেন না। পরে এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে খবর পেয়ে বাবা রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি নিজের মেয়ের মতোই এই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন করেছেন। রুহুল আমিনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আফসানা বলেন, সমাজে এ ধরনের মানুষ থাকতে পারে, তা তিনি চিন্তাও করেননি।

অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়া নাটোরের বড়াইগ্রামের ওয়ালিয়া বাজারের ব্যবসায়ী রুহুল আমিনের এক অনন্য নেশা। গত ২৪ বছর ধরে তিনি এই মানবিক কাজ করে আসছেন। প্রতিটি বিয়ের তারিখ, স্থান, ছবি ও ভিডিও তিনি যত্নসহকারে সংরক্ষণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে এক মেয়ের বাবা রুহুল আমিন এ পর্যন্ত ১১৩ জন মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন।

নিজের এই ব্যতিক্রমী শখ নিয়ে রুহুল আমিন বলেন, ‘এই পৃথিবীতে অনেকের অনেক রকম শখ রয়েছে। আমি আমার উপার্জিত অর্থ দিয়ে সমাজের হতদরিদ্র মেয়েদের বিয়ে সম্পন্ন করে দিতে চাই। এটাই আমার শখ। এর বিনিময়ে এ জীবনে কিছুই চাই না। সৃষ্টিকর্তা পরকালে আমাকে নিশ্চয় প্রতিদান দেবেন। আমি এ পর্যন্ত ১১৩ জন মেয়েকে বিয়ে দিলাম। আমি মনে করি আমি ১১৩ জন মেয়ের বাবা। ওরা আমার মেয়ে-জামাই। আমার নিজের একটি মেয়ে রয়েছে।’

এর আগে গত ২১ আগস্ট রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে ১১২তম বিয়ের আয়োজন করেছিলেন রুহুল আমিন। ১০ বছর আগে বাবা হারানো সুমাইয়া জানান, তাঁর বিয়ে নিয়ে মা অত্যন্ত দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রুহুল আমিনের সহযোগিতায় অত্যন্ত ধুমধাম করে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়। একইভাবে গত ২১ জুন নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের ঈশানগাতি গ্রামের রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে ১০৯তম বিয়ের আয়োজন করেন তিনি। রাবেয়া জানান, আট বছর আগে তাঁর বাবা জালাল মোল্লা ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। রুহুল আমিনের সহযোগিতায় জাঁকজমকপূর্ণভাবে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয় এবং বিয়ের পর এখনো তিনি তাঁদের খোঁজখবর নেন।

রুহুল আমিনের এই মহতী উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে। ওয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম বলেন, রুহুল আমিন ওয়ালিয়া বাজারের একজন ব্যবসায়ী। তিনি মাঝেমধ্যেই গরিব–দুঃখী মেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতা করেন। নিজে উপস্থিত থেকে ধুমধাম করে নিজের মেয়ের মতোই বিয়ে দেন। পুরো বিয়ের খরচ বহন করেন। কাবিনে নিজে সাক্ষী হন। তাঁর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ।

বড়াইগ্রামের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘স্থানীয় লোকজনের কাছে রুহুল আমিনের উদ্যোগে ১১২তম মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা শুনেছি। অসহায় পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে এ ধরনের সহযোগিতা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তাঁর এই মানবিক কর্মকাণ্ড সমাজের অন্য বিত্তবানদেরও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে উৎসাহিত করবে।’

ছবি/কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo